সংসদ কার্যকর করে বিরোধী দলকে সুযোগ না দিলে রাজপথ-সংসদ একাকার হয়ে যাবে: নাহিদ
সংসদ কার্যকর করে বিরোধী দলকে যথাযথ ভূমিকা পালনের সুযোগ না দিলে রাজপথ ও সংসদ একাকার হয়ে যাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জনগণের অধিকার ও তাদের সমস্যার সমাধান সংসদ থেকে না এলে এই সংসদের কোনো প্রয়োজন নেই।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ১১ দলীয় ঐক্যের আয়োজনে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, 'আমরা এখনো সংসদে আছি। সংসদকে কার্যকর করলে দেশের সমস্যার সমাধান হয়তো কিছুটা খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু এর জন্য সংবিধান সভা তৈরি করতে হবে এবং বিরোধী দলকে তাদের যোগ্য জায়গা ও উপযুক্ত স্পেস দিতে হবে।' সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, 'একসঙ্গে আলোচনায় বসুন। দল সমর্থন না দিলে একা এই দেশ চালানো সম্ভব নয়—এই বাস্তবতা মেনে নিন।'
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির এই নেতা বলেন, স্বৈরাচার রেখে যাওয়া সমস্যার কারণে দেশে অরাজকতা হচ্ছে—এমন বক্তব্য দিয়ে সরকার দায় এড়াতে পারে না। তিনি বলেন, 'সমস্যার সমাধান যদি করতে না পারেন, তাহলে প্রথমে জনগণের কাছে স্বীকার করুন। স্বীকার করুন, একার পক্ষে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। স্বীকার করুন, দেশ পরিচালনার জন্য আপনার কোনো পরিকল্পনা নেই।'
সরকার জনগণের সমস্যার সমাধান করতে না পারলে পতিত স্বৈরাচারের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'আমরা পতিত স্বৈরাচারকে ফিরে আসার কোনো পথ করে দিচ্ছি না। আপনারাই সেই পথ তৈরি করছেন। কারণ জনগণকে আপনারা সমস্যার সমাধান দিতে পারছেন না। ফলে জনগণ বিকল্প খুঁজছে। আজকের লংমার্চে বাংলাদেশের জনগণ দেখেছে সেই বিকল্প শক্তি কারা।' একইসঙ্গে নতুন কোনো স্বৈরাচারকে বাংলাদেশে জায়গা দেওয়া হবে না বলেও তিনি ঘোষণা দেন।
সংবিধান সংস্কারে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংসদ কার্যকর না হওয়ার কারণেই আন্দোলন রাজপথে গড়িয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, 'গণভোটের গণরায় অনুযায়ী শুরুতেই যদি সংবিধান সভা করতেন, তাহলে সেখানে আমরা আলোচনা করতে পারতাম। কিন্তু সেটা না করে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।'
বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের যথাযথ দায়িত্ব না দেওয়ার অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'বিরোধীদলীয় এমপিদের আসনে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। বরং বিএনপির সংরক্ষিত নারী এমপিদের সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জনগণের নির্বাচিত এমপিদের কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে সংসদকেও একদলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।' সংসদ পরিচালনায় বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'সালাহউদ্দিন সাহেব যদি একাই সংসদ চালান, তাহলে বিরোধী দলের সংসদে যাওয়ার প্রয়োজন কী? তিনি যদি বিরোধী দলের দায়িত্বও পালন করতে পারেন, তাহলে তিনিই সংসদ চালান। আমরা রাজপথে জনগণের সঙ্গে থাকি।'
তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, 'আপনার বাবা যে ভুল করেছেন, আপনি সেই ভুল করতে যাবেন না। যত স্বৈরাচার এসেছে, শেষ পর্যন্ত কেউ রক্ষা পায়নি। আপনিও রক্ষা পাবেন না।'
লংমার্চের ছয় দফা দাবির কথা তুলে ধরে তিনি জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত, সংস্কার বাস্তবায়ন, গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা এবং জনগণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, 'সরকার এসব দাবি বাস্তবায়ন করলে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে। কিন্তু আপনি দুর্নীতি করলে, আপনার আশপাশের সবাই সিন্ডিকেট করে লুটপাট করলে আমরা এক বিন্দু পরিমাণ সহযোগিতা করব না।'
পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় এই চিফ হুইপ বলেন, 'আমরা এই অধিবেশনে এখনো আছি। পরের অধিবেশনে যাব কি না, তা এখনো নিশ্চিত নই। জনগণের অধিকার ও সমস্যার সমাধান যদি সংসদ থেকে না আসে, তাহলে এই সংসদ কোনো কাজেই আসবে না।'
সবশেষে সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, 'সংসদ ও রাজপথ একাকার হয়ে যাওয়ার আগেই আপনি হয় জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, অথবা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ পরিচালনার পথ খুঁজে বের করুন। পতিত স্বৈরাচার ১৬ বছর জনগণকে অপেক্ষা করিয়েছে। আমরা আপনার জন্য ১৬ বছর বা পাঁচ বছরও অপেক্ষা করব না। জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে তার পরিণতি আপনাকে ও আপনার দলকে দিতে হবে।'
