সরকারের বিরুদ্ধে ১.৩৫ লাখ মামলা, পরিচালনায় বছরে খরচ ১,০০০ কোটি টাকা
সরকারি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলার পাহাড়ে স্থবির হয়ে পড়েছে সার্বিক প্রশাসনিক কার্যক্রম, একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খসে পড়ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।
চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে সরকারের বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজারে, যা পাঁচ বছর আগের প্রায় ৯৫ হাজার মামলা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
এই বিপুল মামলা সামলাতে সরকারকে গুণতে হচ্ছে চড়া মাশুল। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইনি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্যানেলভুক্ত প্রায় ২ হাজার আইনজীবী এসব মামলা পরিচালনা করছেন। তাঁদের ফি এবং আইনি খরচ বাবদ সরকারের বছরে আনুমানিক ১,০০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হচ্ছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর অনুবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কেবল আইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতেই গত এক দশকে সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা।
কেবল সরাসরি আইনি ফি-ই নয়, বছরের পর বছর আপিল মামলা ঝুলে থাকায় সুদের কারণে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। কেবল ২০২৫ সালেই বিভিন্ন দাবির বিপরীতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর সরকারকে মেটাতে হয়েছে ৮৭০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা শাসনব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত বিঘ্নিত করছে। ফলে নতুন নীতি বাস্তবায়নের চেয়ে কর্মকর্তাদের অতীত সিদ্ধান্তের আইনি সুরক্ষায় বেশি ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
কেন্দ্রবিন্দু শিক্ষা খাত: প্রশাসনিক স্থবিরতা
সারাদেশে সরকারের বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা মোট মামলার ৬০ শতাংশের বেশি বা প্রায় ৮৩,৫০০টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে; বিশেষ করে স্কুল ও কলেজের এডহক কমিটিকে কেন্দ্র করেই দায়ের করা হয়েছে ১,৭০০টিরও বেশি রিট পিটিশন।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন সম্প্রতি এই প্রশাসনিক স্থবিরতার চিত্র তুলে ধরে জানান, মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে ৩২,৫০০ শিক্ষক নিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি নিয়োগ প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে গেছে।
বিষয়টি সংসদেও উত্থাপিত হয়েছিল।
গত ১৭ জুন সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন ফারুক বিষয়টি উত্থাপন করলে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ৩২ হাজার ৫০০ শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াসহ— আরও ২ হাজার ৬০০ এবং ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম মামলার কারণে ঝুলে আছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, "দেশের শিক্ষাখাতে বর্তমানে প্রায় ৮৩ হাজার ৫০০ মামলা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর, বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১৩ হাজার ৭৮টি। শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কাঁধেই রয়েছে ৫ হাজার ৮৩১টি মামলা এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে (ডিপিই) রয়েছে ৩ হাজার ২৮২টি মামলা। এই বিপুলসংখ্যক মামলার ভারে শিক্ষা প্রশাসনের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।"
মামলার বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সম্প্রতি মুঠোফোন ও খুদে বার্তায় যোগাযোগ করা হলেও মন্ত্রীর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার নথি অনুযায়ী, তিনটি বিভাগ, ১৬টি দপ্তর, ১১টি শিক্ষা বোর্ড এবং ১৭০টি সরকারি–বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৩ হাজার ৭৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একার কাঁধে রয়েছে ৫ হাজার ৮৩১টি মামলা। আর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর লড়ছে ৩,২৮২টি মামলা। বর্তমানে ১১টি শিক্ষা বোর্ড সম্পর্কিত ১,৬৬৩টি মামলা ঝুলে আছে—যার মধ্যে ১,৫৫২টি নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এবং ১১১টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের।
সুপ্রিম কোর্ট, আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর উইং এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, স্কুল ও মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং কলেজের গভর্নিং বডি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে হাইকোর্টে এখনও প্রায় ৮,০০০ রিট পিটিশন বিচারাধীন রয়েছে। এসব রিট পিটিশনের প্রতিটিতেই শিক্ষা সচিবকে বিবাদী করা হয়েছে।
এছাড়াও শিক্ষক নিয়োগ, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে নিয়োগ, পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনঃমূল্যায়ন, কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী-কাম-নাইট গার্ড নিয়োগ নিয়েও প্রচুর মামলা রয়েছে। পদোন্নতি, এমপিওভুক্তি, বদলি, ওএসডি করা এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েও রিট পিটিশন করা হয়েছে।
পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মামলার চাপ
শিক্ষা খাত সবচেয়ে বড় চাপ সামলালেও মামলার এই ব্যাপক চাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাষ্ট্রের অন্যান্য সংস্থাতেও।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের তথ্যমতে, মোট ১.৩৫ লাখ রিট পিটিশন ও আপিলের মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার মামলা ২০১০ সালের আগে দায়ের করা হয়েছিল। বাকি মামলাগুলো গত ১৬ বছরে দায়ের করা।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে আইন সংশোধনের দাবি, পদোন্নতি ও সরকারি নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ স্থগিতের আবেদন, নতুন উদ্যোগের দাবি এবং সরকারি গাড়ির দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চাওয়ার মতো বিষয়। এছাড়া নিয়োগ বিতর্ক, চিকিৎসা সেবা পাওয়ার দাবি, সরকারি আবাসন, খাস জমি ও অধিগ্রহণ করা জমি এবং কর ও ভ্যাট সংক্রান্ত অসংখ্য রিট ও আপিল বিচারাধীন রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সলিসিটর উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের বিরুদ্ধে প্রায় ৬ হাজার রিট পিটিশন বিচারাধীন রয়েছে।
এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের বিরুদ্ধে ১,৬০০টি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ১,১০০টি, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ২,১০০টি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ৭৪৫টি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বিরুদ্ধে ২,০৫৬টি, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের বিরুদ্ধে ৬৩৮টি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ৬৫৬টি মামলা রয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিরুদ্ধেও ৮১৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা ও সরকারি প্রতিক্রিয়া
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ঠুনকো কারণে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রিট মামলা দায়ের হচ্ছে। আবার এসব মামলায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল অর্থাৎ যারা মামলা পরিচালনার সাথে যুক্ত থাকেন, তাদের একটি বড় অংশ দায়ী। সরকার মামলার বিবাদী হওয়ার পর মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী বা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার পর—এনিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতনরা সেভাবে খেয়াল রাখেন না। ফলে যা হবার তাই হয়।
এতে করে যারা ন্যায়বিচার চেয়ে রিট বা মামলা করেন, তারা বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে অনেকসময় মৃত্যুবরণ করার পরেও ন্যায়বিচার পান না। আবার সরকারের কাঁধে মামলার চাপ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
সরকারের বিরুদ্ধে মামলা মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন উপ-সচিব টিবিএসকে টিবিএসকে বলেন, "মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা মনিটরিং করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি মামলা নিষ্পত্তির জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সাথে কাজ করছে। তবে এপর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। মামলা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।"
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তাদের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লিয়াজোঁ করে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস কাজ করছে, যাতে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া যায়।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, সরকারের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট মামলা দেখভালের জন্যই অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস কাজ করছে। "নতুন প্রেক্ষাপটে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। পুরাতন অনেকগুলো মামলা নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।"
সমাধান কোন পথে
ড. শাহদীন মালিক বলেন, সরকারের কাঁধ থেকে মামলার চাপ কমাতে সংশ্লিষ্টদের সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, "সরকারের একটি মিনিটরিং কমিটি রয়েছে, যাকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অনেক মামলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলা রয়েছে, যা পরিহারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে সরকারের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট পুরানো মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক হাইকোর্ট ও আপিল বেঞ্চ গঠন করার উদ্যোগ নিতে হবে।"
