এআই তৈরি করতে পারে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা: হুঁশিয়ারি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নরের
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি করতে পারে। এমনকী আর্থিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে জি-২০ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের সতর্ক করেছেন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি।
বর্তমানে বিশ্বের প্রধান প্রধান পুঁজিবাজারগুলোয় চাঙ্গাভাব রয়েছে এআই কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর। অনেক কোম্পানির শেয়ারদর মাত্রাতিরিক্ত স্ফীত হয়েছে—এমন কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
অ্যান্ড্রু বেইলি বলেছেন, এআই খাতে প্রবৃদ্ধির যেকোনো ধরনের ধস বা পতন—বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে পুঁজিবাজারগুলোতে। যা শেয়ারদরকে "বাজার সমন্বয়ের" (মার্কেট কারেকশন) দিকে নিয়ে যাবে।
এই সমন্বয়ের অর্থই হবে, শেয়ারমূল্যের স্ফীত অবস্থান থেকে নাটকীয় পতন— যা পুরো আর্থিকখাতকে নাড়া দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনায় জি-২০ ভুক্ত দেশের অর্থমন্ত্রীরা এক সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। গতকাল সোমবার তাদের উদ্দেশ্য লেখা এক খোলা চিঠিতে তিনি বলেন, একযোগে একাধিক প্রতিষ্ঠানে বিপর্যয় তৈরি করতে পারে—এমন সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সম্মুখীন হওয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর এখনই প্রস্তুত থাকা উচিত।
চলতি মাসের শুরুর দিকে গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যানথ্রোপিক এবং ওপেনএআই-সহ ১০০টি প্রতিষ্ঠানের একটি জোটও— বিভিন্ন দেশ ও সংস্থাকে তাদের সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানায়, যাতে সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর বা ফাঁকি দেওয়ার মতো শক্তিশালী হয়ে না ওঠে এআই প্রযুক্তি।
এমন প্রেক্ষাপটে বেইলি তাঁর খোলা চিঠিতে জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের বলেন, চড়া শেয়ারবাজার, বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান ঋণ গ্রহণ এবং গুটিকয়েক বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রচুর মূলধন কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্মিলিত প্রভাব—ভবিষ্যতে পুঁজিবাজারের পতন বা সমন্বয়ের ঝুঁকিকে বহু গুণে বাড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, "বিষয়টি শুধু বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই উচ্চ ঋণগ্রহণের সঙ্গে শেয়ারের অতিরিক্ত মূল্যায়ন এবং বাজারে কেন্দ্রীভূত থাকার প্রবণতা—বিশেষ করে এআই প্রতিষ্ঠান ও হাইপারস্কেলারগুলোর (বড় ক্লাউড ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান) মধ্যে পারস্পরিক বিনিয়োগের বৃদ্ধি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের বাজার পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।"
আর্থিক নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থা ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে—বিশ্বব্যাপী নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে এআই মডেল প্রকাশ ও ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান এই কেন্দ্রীয় ব্যাংকার।
আন্তর্জাতিক তদারকি সংস্থা– ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বোর্ডের (এফএসবি) চেয়ারম্যান হিসেবে এই চিঠি লেখার সময় বেইলি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের কারণে বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এমন সময়ে বেইলির এই হুঁশিয়ারি এলো, যখন যুক্তরাজ্য সরকার বিদেশি এআই কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে স্থানীয়ভাবে তৈরি এআই প্রযুক্তি বিকাশ ঘটাতে। এর মাধ্যমে তাঁরা এআই প্রযুক্তিতে সার্বভৌম সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
দেশটির মন্ত্রীরা চান, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর অপেক্ষমাণ তালিকার দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং সাইবার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা জোরদার করার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়— বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সরকারি তহবিলের জন্য প্রতিযোগিতায় নামুক।
তবে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন এমন সব মডেল তৈরি করছে, যা ব্যাংক ও আর্থিক কেন্দ্রগুলোর সুরক্ষা ব্যূহ বা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অনায়াসে ফাঁকি দিতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
চলতি বছরের গ্রীষ্মকালীন সময়ে দেখা গেছে—ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক ও মেটার তৈরি এআই টুলগুলো এমন সব কাজ করছে যা তাদের করার কথা নয়; এমনকি কিছু এআই এজেন্ট সাইবার নিরাপত্তা বলয় পার হওয়ার জন্য বাস্তবে অস্তিত্ব থাকা মানুষদের ছদ্মবেশ ধারণ করার মতো বিপজ্জনক আচরণও করেছে।
বেইলির নেতৃত্বাধীন সংস্থা এফএসবি হলো একটি আন্তর্জাতিক তদারকি পরিষদ, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম তদারকি করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, চীন এবং সৌদি আরবের মতো দেশের নীতি-নির্ধারকেরা এই সংস্থায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
