সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য মুসলিম দেশগুলোতে কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে সরকার
আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে অনিয়ম-দুর্নীতিতে সমস্যাগ্রস্ত হয়ে পড়া বেসরকারি খাতের ৫ ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত রাষ্ট্রমালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার (কৌশলগত অংশীদার) পেতে বিভিন্ন মুসলিম দেশ ও সংস্থাকে প্রস্তাব দিচ্ছে সরকার।
এ ব্যাংকে বিনিয়োগ করার জন্য ইতিমধ্যে কাতারকে প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর কাতার সফরের সময় দেশটিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিতুমীর টিবিএসকে বলেন, 'আমরা কাতারকে ইতিমধ্যে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হওয়ার প্রস্তাব করেছি। সেখানে এ বিষয়ে আলোচনা হলেও এখনও চূড়ান্ত কিছু হয়নি।
'বিষয়টি নিয়ে কাতারের সঙ্গে আরও আলোচনা হবে এবং অন্যান্য মুসলিম দেশ ও সংস্থাগুলোকেও আমরা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হওয়ার প্রস্তাব দেবো।'
তিনি বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে আগে নেওয়া 'হেয়ারকাট' সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
'আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধ করতে দুটি পথ খোলা আছে—সরকারের কোষাগার থেকে অর্থ দেওয়া অথবা বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থাকে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে এই ব্যাংকের মালিকানায় নিয়ে আসা। এর কারণেই মুসলিম দেশ ও সংস্থাগুলোকে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে বিনিয়োগে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে,' বলেন তিনি।
একটি ব্যাংকের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বা কৌশলগত অংশীদারদের মূল দায়িত্ব হলো ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও ব্যবসায়িক পরিধি বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখা। তারা সাধারণত শুধু সাধারণ শেয়ারহোল্ডার বা বিনিয়োগকারী নয়, বরং ব্যাংকের পরিচালন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে।
স্ট্র্যাটেজিক পার্টনাররা ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করতে বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি তহবিল বা ইক্যুইটি বিনিয়োগ করে এবং সংকটের সময়ে ব্যাংককে আর্থিক ব্যাকআপ দিয়ে স্থায়িত্ব ধরে রাখে।
মুনাফা পেতে এফডিআর অ্যাকাউন্টধারীদের স্কিমের আওতায় থাকতে হবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন ডিপার্টমেন্ট গতকাল এক সার্কুলারে জানিয়েছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা তাদের অ্যাকাউন্টে থাকা ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্টের (এফডিআর) পুরো অর্থ একসঙ্গে তুলতে পারবেন, তবে এক্ষেত্রে কোনো রকমের মুনাফা পাবেন না।
আর এফডিআর অ্যাকাউন্টধারীদের মুনাফা পেতে হলে ব্যাংক রেজল্যুশনের স্কিমের আওতার মধ্যে থাকতে হবে।
আর যেসব আমানতকারীর কারেন্ট ও সেভিংস অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তারা মুনাফাসহ একবারে আসল তুলতে পারবেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবের গ্রাহকদের মূল আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হচ্ছে ৭ সেপ্টেম্বর। প্রাথমিকভাবে গ্রাহকেরা তাদের হিসাব থেকে জমানো সম্পূর্ণ মূল অর্থ এককালীন তুলতে বা নগদায়ন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কোনো মুনাফা পাবেন না তারা। এজন্য আজ থেকে আবেদন গ্রহণ করবে ব্যাংকটির শাখাগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, আজ (১ সেপ্টেম্বর) থেকেই ব্যক্তি হিসাবে স্বাভাবিক লেনদেন পুনরায় শুরুর সিদ্ধান্ত রয়েছে।
তবে শাখা ও উপশাখাগুলোতে নগদ টাকার রিকুইজিশন পাঠানো, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নগদ টাকার জোগান নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিমুক্ত ক্যাশ ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে কয়েক দিন সময় প্রয়োজন। সেজন্য ৭ সেপ্টেম্বর থেকে পুরোদমে আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্মিলিত ব্যাংকের অবস্থা
এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রিত ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক এবং আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রিত এক্সিম ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে অন্তবর্তীকালীন সরকার ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। নবগঠিত ব্যাংকটি শতভাগ সরকার মালিকানাধীন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীর সঞ্চয়ী হিসাবে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
পাঁচ ব্যাংকের মোট ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৮৬ শতাংশ এখন খেলাপি। আর মূলধন ঘাটতি রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
সরকারি মালিকানার ব্যাংক হিসেবে গত বছরের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে।
