ভ্যাকসিনে বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়াতে ২০২৭ সালের মে’র মধ্যে ডব্লিউএইচওর শর্ত পূরণের লক্ষ্য সরকারের
প্রায় এক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়েও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ম্যাচিউরিটি লেভেল-৩ (এমএল-৩) অর্জন করতে না পারায় বৈশ্বিক ভ্যাকসিন বাজারে এখনও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে আগামী ২০২৭ সালের মে মাসে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশের (ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি) আগেই এমএল-৩ অর্জন করতে চায় সরকার।
এ লক্ষ্য অর্জনে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন, জনবল সক্ষমতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী ওষুধ ও ভ্যাকসিন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় এমএল-৩ অর্জনের লক্ষ্যে গত ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় দেশের ভ্যাকসিন ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বর্তমান সক্ষমতা পর্যালোচনার পাশাপাশি বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে দ্রুত অগ্রগতির জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এমএল-৩ মূলত একটি দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, বিশেষ করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) সক্ষমতা উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়, দেশে উৎপাদিত ভ্যাকসিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সব মানদণ্ড মেনে উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, "আমরা বর্তমানে ম্যাচিউরিটি লেভেল-২-এ আছি। ডব্লিউএইচও ২০২১ সালে বাংলাদেশের সক্ষমতা মূল্যায়নে একটি আনুষ্ঠানিক মিশন পরিচালনা করেছিল। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে আমাদের ২১১টি সূচক পূরণের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।"
এসব সূচক পূরণে ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দারকে চেয়ারম্যান করে উচ্চপর্যায়ের একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে সরকার। এতে ডব্লিউএইচও, ডিজিডিএ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মন্ত্রণালয় এবং দেশের তিন ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান—ইনসেপ্টা, হেলথকেয়ার ও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস যুক্ত রয়েছে।
ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, "প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং দ্রুততার সঙ্গে সব কার্যক্রম বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। আমরা আশা করছি, ২০২৭ সালের মে মাসে পরবর্তী বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশের আগেই এমএল-৩ অর্জন করতে পারব।"
গত ১ আগস্ট বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকেও দ্রুততম সময়ের মধ্যে এমএল-৩ অর্জনের সিদ্ধান্ত হয়।
জনবল সংকট কাটাতে নতুন অর্গানোগ্রাম
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এমএল-৩ অর্জনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে সংস্থাটি।
বাংলাদেশে এই সক্ষমতা গড়ে তোলার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানবসম্পদের ঘাটতি। মার্কেট অথরাইজেশন বা ইন্সপেকশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে যেখানে ২০ থেকে ৩০ জন দক্ষ বিশেষজ্ঞ থাকা প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ৪ থেকে ৬ জন।
পর্যাপ্ত রেগুলেটরি সায়েন্টিস্ট, প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও শক্তিশালী কারিগরি দলের অভাব দীর্ঘদিন ধরে অগ্রগতিকে ধীর করে রেখেছে। তবে এ সংকট কাটাতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, "প্রয়োজনীয় জনবলের চাহিদা ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং নতুন অর্গানোগ্রামও খসড়া করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব পদের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে মানবসম্পদসংক্রান্ত লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে পারব।"
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এমএল-৩ অর্জনের জন্য কোন কাজ কে করবে, কত দিনের মধ্যে করবে, কখন প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত হবে এবং কখন ডব্লিউএইচও মূল্যায়ন করবে—সবকিছুর নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। ঢাকায় ডব্লিউএইচওর কার্যালয়ও ডিজিডিএকে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
বাংলাদেশে ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু হয় ২০১১ সালে। বর্তমানে ইনসেপ্টা, পপুলার ও হেলথকেয়ার—এই তিন ওষুধ কোম্পানি ১৫ থেকে ১৬ ধরনের মানব ও পশুচিকিৎসার ভ্যাকসিন তৈরি করে। এর মধ্যে ইনসেপ্টা খুব অল্প পরিমাণে কয়েকটি আফ্রিকান দেশে ভ্যাকসিন রপ্তানি করে।
শিল্পখাতেও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে
এমএল-৩ অর্জনে সরকারের পাশাপাশি দেশের ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডব্লিউএইচও নির্ধারিত কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (সিজিএমপি) মানদণ্ড পূরণে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, দেশের তিনটি ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ডব্লিউএইচওর নির্ধারিত মান পূরণ করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের কারখানা পরিদর্শন করে ডব্লিউএইচও যাচাই করবে, উৎপাদন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না।
হালিমুজ্জামান বলেন, "তিনটি কোম্পানি আছে। তারা তিনটিতেই যেতে পারে, আবার একটিতেও যেতে পারে। ডব্লিউএইচও যখন যাবে, তখন তারা দেখতে চাইবে ডব্লিউএইচওর যে রিকোয়ারমেন্ট, সেই মান আমরা মেইনটেইন করছি কি না।"
তিনি আরও বলেন, ডব্লিউএইচও ইতোমধ্যে কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা ও কারখানা পরিদর্শন করে বিভিন্ন ঘাটতি চিহ্নিত করেছে। এসব ঘাটতি কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে পূরণ করা হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পনাও জানানো হয়েছে।
হালিমুজ্জামান বলেন, এমএল-৩ অর্জনের ক্ষেত্রে শুধু প্রচলিত জিএমপি মান বজায় রাখাই যথেষ্ট নয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস বা সিজিএমপির সর্বশেষ মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অটোমেশন বাড়ানো এবং মানুষের হস্তক্ষেপ কমানোও আন্তর্জাতিক মান পূরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, "সিজিএমপি একটি স্থির বিষয় নয়। ডব্লিউএইচও, ইউএস এফডিএসহ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নিয়মিত তাদের প্যারামিটার আপডেট করছে। আগে যে প্যারামিটার ছিল, এখন সেটি আরও কঠোর হয়েছে। নতুন নতুন রিকোয়ারমেন্ট যুক্ত হচ্ছে।"
তিনি বলেন, অডিটে কোনো ঘাটতি ধরা পড়লে শুধু তা সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন অনুমোদন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ভ্যাকসিন রপ্তানির পাশাপাশি বাড়বে বিনিয়োগ
ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, এমএল-৩ অর্জনের মূল লক্ষ্য শুধু ভ্যাকসিন রপ্তানি নয়; বরং বৈশ্বিক ভ্যাকসিন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
তিনি বলেন, "আমাদের লক্ষ্য হলো বৈশ্বিকভাবে ভ্যাকসিনের বাজার সম্প্রসারণ করা এবং ভ্যাকসিন উৎপাদনে আরও বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। এর একটি ইতিবাচক প্রভাব অন্যান্য ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের ওপরও পড়বে।"
হালিমুজ্জামান জানান, এমএল-৩ অর্জন হলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার বাড়বে। এর মাধ্যমে দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ওষুধ শিল্পের গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এমএল-৩ দ্রুত অর্জনের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ায় সব লক্ষ্য পূরণ করে ২০২৭ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ এমএল-৩ অর্জন করতে পারবে বলে আমরা আশাবাদী।"
