ইরানে আবার হামলা যুক্তরাষ্ট্রের; জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা আইআরজিসির
এক মাসের মধ্যে রোববার প্রথমবারের মতো দক্ষিণ ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ হামলার জবাবে জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। মার্কিন হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন।
রোববার ইরানের সংবাদ সংস্থাগুলোতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বয়ে পরিচালিত এই যৌথ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে 'পানিশমেন্ট অভ দি অ্যাগ্রেসর'। এ অভিযানে জর্ডানের কিং হুসেইন ও আল আজরাক ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়েছে।
এদিকে আইআরজিসি বলেছে, তাদের পাল্টা হামলায় 'শত্রুপক্ষের কারিগরি ও মেরামত অবকাঠামো এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস' হয়েছে এবং এতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি সাধন হয়েছে।
আইআরজিসি হামলার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই জর্ডান আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানায়।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, 'আজ সোমবার ভোরে দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী আটটি ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে।'
তবে কোনো ঘাঁটিতেই কেউ হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'হরমুজ প্রণালির ওপর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে শত্রুপক্ষ যে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে, আগ্রাসন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দিয়ে তা সফল হবে না। বরং প্রতিটি হামলার জবাব দেওয়া হবে আরও বিধ্বংসী উপায়ে।'
এর আগে রোববার লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার পর তেহরান পাল্টা আক্রমণ চালানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল।
লারাক দ্বীপ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বন্দর আব্বাসের অদূরে উপকূলীয় এলাকায় এবং হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত। বর্তমানে ইরান তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে তল্লাশির জন্য এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যেতে বাধ্য করছে। পাশাপাশি নৌযানগুলোকে প্রণালি পারাপারের জন্য ২ মিলিয়ন ডলার ফি-ও নিচ্ছে।
জুলাইয়ের শেষভাগের পর এটিই দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া প্রথম সংঘাত। সর্বশেষ ২৯ জুলাই মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে হামলা চালিয়েছিল। ওই সময় তারা উপকূলীয় নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ আইআরজিসির কয়েক ডজন স্থাপনায় হামলার ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর ১ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, উপসাগরীয় মিত্র দেশ কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনুরোধে তিনি নতুন হামলা স্থগিত করতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দেবেন।
ওয়াশিংটন যখন বোমাবর্ষণের পরিবর্তে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশলের দিকে এগোচ্ছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ যখন সপ্তম মাসে গড়াচ্ছে, তখন এই পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন করে সামরিক সংঘাত উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেন, হরমুজ প্রণালির দিকে মাইনবাহী রকেট ছোড়ার জন্য প্রস্তুত রাখা লারাক দ্বীপের কিছু লঞ্চার লক্ষ্য করে মার্কিন হামলাটি চালানো হয়েছিল।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডও আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক মাইনবাহী রকেট ছোড়ার জন্য আইআরজিসিকে প্রস্তুতি নিতে দেখার পর লারাক দ্বীপে দুটি ইরানি লঞ্চারে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী।
গত কয়েক সপ্তাহে ওয়াশিংটন হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে। তাদের ভাষ্যমতে, তেহরানের অবরোধ সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক সুরক্ষায় এই নৌপথ দিয়ে লাখ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে।
তা সত্ত্বেও এই প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের ওপর প্রায় প্রতিদিনই হামলার খবর আসছে এবং ইরানও নৌপথটি বন্ধ রাখার বিষয়ে নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
রোববারের হামলা থেকে বোঝা যায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের দাবির বিষয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা কঠোর করেছে। তা সত্ত্বেও সামরিক শক্তি প্রয়োগের পথ থেকেও পিছু হটেনি ওয়াশিংটন।
ইরান এর আগেও একই ধরনের মার্কিন হামলার জবাবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশ ও কোম্পানিগুলোর ওপর পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে ইরানকে আর্থিকভাবে একঘরে করার উদ্যোগের ঘোষণা দেয়।
কয়েক মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই মূলত ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিয়েছে। কারণ এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্বের অন্যান্য অংশে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতিকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যদিও পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ বলেছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত।
মার্কিন কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরান নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে বলে দাবি করে আসছেন। তারা আরও বলছেন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধের কারণে দেশটি এখন অর্থনৈতিক পতনের দ্বারপ্রান্তে।
তবে তেহরানও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। তারা বলছে, যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মোকাবিলার জন্য তারা প্রস্তুত।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, নৌপথ অবরুদ্ধ করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পেতে রাখা সব মাইন হয় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস, নয়তো অপসারণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নতুন করে মাইন মোতায়েনের কাজে যুক্ত যেকোনো জাহাজ বা নৌকা ধ্বংস করে দেওয়া হবে বলে ইরানকে আগেই সতর্ক করা হয়েছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি ট্রাম্পের এই দাবিকে এক ধরনের 'প্রোপাগান্ডামূলক' প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
এছাড়া শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ তেল পার করে নেওয়ার খবর প্রত্যাখ্যান করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আরাগচি লেখেন, 'আমাদের গোয়েন্দা তথ্য অনুসাড়ে, জ্বালানি বাজার নিয়ে বড় ধরনের কারসাজির চেষ্টা চলছে। মার্কিন সরকারের কিছু অংশ নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে এবং [ট্রাম্পকে] নিশ্চিত পরাজয়ের যুদ্ধে জড়িয়ে রাখতে সহজ-সরল গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে বাজার প্রভাবিত করছে। ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠীগুলোও যুদ্ধের পক্ষে মনগড়া ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরছে। অথচ এর আসল ভুক্তভোগী সাধারণ মার্কিন নাগরিকরাই।'
ওয়াশিংটন কৌশলগত এই নৌপথের ওপর থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ খর্ব বা শিথিল করার নানা দাবি করলেও, সরবরাহ সংকটের অনিশ্চয়তার কারণে তেলের দাম এখনও বেশ চড়া।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন (৩.৮ লিটার) পেট্রোলের গড় দাম এখনও ৪ ডলারের বেশি। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তখন এর দাম ছিল ৩ ডলারের কম।
জ্বালানির এই চড়া দাম যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক পরিসরে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ এখন ছয় মাস অতিক্রম করেছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট খনিজ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
