সাভার মহাসড়কের আলোকসজ্জায় উইন্ড টারবাইন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উৎসাহ দেওয়াই লক্ষ্য প্রশাসনের
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশ থেকে স্তূপকৃত বর্জ্য অপসারণ করে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ এবং নতুন করে সেখানে বর্জ্য ফেলা বন্ধে স্টিলের ফেন্সিং করার পর এবার মহাসড়কের পাশে তৈরি করা সেই বাগানের আলোকসজ্জায় উইন্ড টারবাইন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার সাভার উপজেলা প্রশাসন।
মূলত, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মানুষকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উৎসাহিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম।
টিবিএসকে প্রশাসক বলেন, 'নতুন করে ওই স্থানে বর্জ্য ফেলা বন্ধে যেহেতু আমরা প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কজুড়ে স্টিলের ফেন্সিং দিয়ে বেড়া দিয়েছি, সেহেতু দুর্ঘটনা এড়াতে সেখানে সেই বেড়ার সীমানা স্পষ্ট করতে লাইটিংও জরুরি। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ আলোকসজ্জায় ব্যবহার করা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। সে কারণেই আমরা সেখানে দুটি এক কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন উইন্ড টারবাইন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। এই টারবাইন থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎই আলোকসজ্জায় ব্যবহৃত হবে।'
'এছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকায় প্রায়শই এই এলাকায় ভিভিআইপিসহ বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের আগমন ঘটে, ফলে তাদের প্রতি একটি বার্তা দেওয়া যে জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায় থেকেও আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়ে সচেতন এবং পর্যায়ক্রমে আমরা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছি, একইসাথে মহাসড়কে চলাচলরত সাধারণ মানুষও যেন নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত হয় সেই উদ্দেশ্য থেকেই আমাদের এই উদ্যোগ,' যোগ করেন সাইফুল।
সোলারের পরিবর্তে উইন্ড টারবাইন কেন, প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, 'সাধারণ মানুষ সোলারের সাথে বেশ আগে থেকেই পরিচিত, তাছাড়া সড়কের পাশে সোলার প্যানেল মানুষকে খুব বেশি আকৃষ্ট করতে পারবে না। যে কারণে আমরা তুলনামূলক কম পরিচিত উইন্ড টারবাইন বেছে নিয়েছি যেন সহজেই তা মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে। পাশাপাশি এই এলাকায় সারা বছর পর্যাপ্ত বায়ুপ্রবাহ রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আরিচাগামী লেনের বলিয়ারপুর ভাঙ্গাব্রিজ এলাকা থেকে শুরু করে মোট পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মহাসড়কের পাশে বর্জ্য ফেলা রোধে এবং সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসাবে একইভাবে ফেন্সিং করে গাছ রোপণ করা হবে। এর মধ্যে শুরুর দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকবে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা। আলোকসজ্জায় ব্যবহৃত ৬ শতাধিক লাইট জ্বলবে সেখানে স্থাপন করা দুটি উইন্ড টারবাইনে উৎপাদিত বিদ্যুতে। ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রোপণ করা হবে প্রায় ৭ হাজার সুপারি, নিম ও তালের চারা। পুরো প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা, যা ব্যয় হবে উপজেলা পরিষদের ফান্ড থেকে। এর মধ্যে এক কিলোওয়াটের দুটি উইন্ড টারবাইনের ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ লক্ষ টাকা।'
বর্জ্যের স্তূপ থেকে সবুজ বাগান
একসময় যেই এলাকা দিয়ে যানবাহনের ভিতরে অবস্থান করেও নাক চেপেপার হওয়া ছিল কষ্টসাধ্য, এখন সেখানে শোভা পাচ্ছে শত শত সুপারি, নিম ও তালের চারা।
সরেজমিনে শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকালে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বলিয়ারপুর ভাঙ্গাব্রিজ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কিছুদিন আগেও যেটি ছিল ময়লার ভাগাড়, এখন সেখানে সড়কের একপাশজুড়ে রয়েছে সারি সারি সুপারি, নিম ও তালগাছের চারা। বেশ কয়েকজন নারী শ্রমিককে এ সময় গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে। পুরুষ শ্রমিকরা ব্যস্ত স্টিলের ফেন্সিংয়ে রং করাসহ বাগানের সীমানা পাকা করার কাজে। প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের পাশজুড়ে ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে ফেন্সিং ও গাছ রোপণের কাজ। স্টিলের বেড়ায় দেওয়া হচ্ছে সবুজ রঙের প্রলেপ।
সৌন্দর্যবর্ধনে নানা প্রজাতির গাছের মধ্যে সুপারি ও নিম কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে সাইফুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'যেহেতু মহাসড়ক, তাই গাছ রোপণের ক্ষেত্রে যেন সেখানে ঝোপঝাড় সৃষ্টি না হয়, সে কারণেই মূলত সুপারি গাছ বেছে নেওয়া। অন্যান্য বড় গাছ লাগানো হলে ঝড়ের মৌসুমে ডাল ভেঙে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। আবার অধিক ঝোপঝাড় হলে অপরাধীদের নিজেদের আড়াল করতেও সুবিধা হয়। আর নিমগাছ মূলত বাতাস বিশুদ্ধ করতে। এভাবেই আসলে সবদিক ভেবে গাছ বাছাই করা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'দায়সারাভাবে শুধু সাময়িক বাহবা নিতে আমরা গাছ রোপণ বা ফেন্সিং করেই ক্ষান্ত হচ্ছি না। ওখানে আমাদের একটি রক্ষণাবেক্ষণ কক্ষ তৈরি হবে, যেখানে সার্বক্ষণিক দু'জন লোক নিয়োজিত করা হবে রোপণকৃত গাছের পরিচর্যাসহ সেখানকার সামগ্রিক বিষয় দেখভাল করতে।'
সাইফুল ইসলাম বলেন, 'সারা বিশ্ব যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঝুঁকছে, সেখানে আমরা এখনো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। সরকার নানা সুবিধা দিলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সোলারসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারে আগ্রহ ও সচেতনতা এখনো কম। আমাদের এই উদ্যোগ যদি কিছু মানুষকে উৎসাহিত করতে পারে, তাহলে আমাদের এই উদ্যোগ সার্থক হবে।'
