‘ঘনঘন মামলার দিন ধার্য করলে আইনজীবীর টাকা দিতে পারি না’ বলে ট্রাইব্যুনালে কাঁদলেন সাবেক বিজিবি কর্মকর্তা রেদোয়ানুল
ঘনঘন মামলার দিন ধার্য করলে আমার খুব কষ্ট হয়, আইনজীবীর টাকাও দিতে পারি না—এ কথা বলতে বলতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কেঁদেছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম।
আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলার এক সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা শেষ হয়। সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষ হলে রেদোয়ানুলের আইনজীবী শাহীনুর ইসলাম সাক্ষীকে জেরা করছিলেন। জেরা চলাকালীন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলার জন্য ট্রাইব্যুনালের অনুমতি চান রেদোয়ানুল ইসলাম।
অনুমতি নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, 'ঘনঘন তারিখ দিলে আমার খুব কষ্ট হয়। আইনজীবীর টাকাও দিতে পারি না। আর্থিকভাবে তেমন কোনো সঞ্চয়ও নেই। একটু লম্বা বিরতি নিয়ে তারিখ দিলে ভালো হয়।'
রেদোয়ানুল বলেন, 'বর্তমানে যে বেতন পাই, তা খুবই সামান্য। এই টাকা দিয়ে সংসার চালাব নাকি আইনজীবীর খরচ দেব, বুঝতে পারি না।'
এ সময় রেদোয়ানুলের আইনজীবী শাহীনুর ইসলামের কাছে বিষয়টি জানতে চান ট্রাইব্যুনাল। তখন ট্রাইব্যুনালকে আইনজীবী বলেন, 'তার কাছ থেকে রিজনেবল ফি-ই নেওয়া হচ্ছে।'
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ট্রাইব্যুনালকে বলেন, 'আসামির মূল চাওয়া ঘনঘন তারিখ পেছানো নয়। বরং মামলার বিচার দ্রুত শেষ হওয়া। অল্প দিনের ব্যবধানে শুনানি হলে বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।'
উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে রেদোয়ানুলের বক্তব্য নিজের হৃদয় স্পর্শ করেছে জানিয়ে মন্তব্য করেন বিচারক। এরপর অসমাপ্ত জেরার জন্য আগামী ২ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন আদালত।
ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জবানবন্দি
চব্বিশের ১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বাম পায়ের হাঁটুর নিচে গুলিবিদ্ধ হন শিক্ষার্থী রাতুল হাসান। সেই গুলি রাতুলের পায়ের পেছন দিয়ে প্রবেশ করে সামনের দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। সে সময় রামপুরা এলাকায় দায়িত্বে থাকা বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলামের নেতৃত্বে তার পায়ে গুলি করা হয় বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষীর জবানবন্দিতে তুলে ধরেন ওই শিক্ষার্থী।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন গুলিবিদ্ধ হওয়া ছাত্র রাতুল হাসান। তিনি এই মামলার ১২ নম্বর সাক্ষী।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন তিনি। এ মামলার চার আসামির মধ্যে দুজন গ্রেপ্তার আছেন। তারা হলেন বিজিবির আলোচিত সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম।
পলাতক অপর দুই আসামি হলেন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান।
সাক্ষীর জবানবন্দিতে তেজগাঁও কলেজের ছাত্র মো. রাতুল হাসান বলেন, '২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বেলা ১১টার দিকে আমি ও আমার বন্ধু রিফাতসহ আরও কয়েকজন মিলে রামপুরায় আন্দোলনে যোগ দিই। ওই দিন আমার বন্ধু রিফাত ইসলাম পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর রামপুরা মাল্টিকেয়ার হাসপাতালের সামনে আমরা আবার আন্দোলনে যোগ দিই। তখন আমাদের সামনে বিজিবি ও পুলিশ অবস্থান করছিল। কোনো রকম সতর্কবার্তা ছাড়াই তারা আমাদের ওপর গুলি বর্ষণ শুরু করে। তখন আমি বেটার লাইফ হাসপাতালের দিকে দৌড় দিই। তখন একটি গুলি আমার বাম পায়ের হাঁটুর নিচে পেছন দিক দিয়ে ঢুকে সামনের দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। ওই ক্ষতস্থানে আমার প্রায় দেড় ইঞ্চির মতো হাড় ক্ষয় হয় এবং ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।'
তিনি যোগ করেন, 'এরপর আমার ভাগ্নে সুলাইমান ও অপর আন্দোলনকারীদের সহায়তায় আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ২৫ জুলাই আমাকে রিলিজ করে দেওয়া হয়। (এ পর্যায়ে সাক্ষী তার পায়ে গুলি লাগার স্থান ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করেন)। ঢাকা মেডিকেল থেকে রিলিজ হওয়ার পর আমি দীর্ঘদিন কল্যাণপুরস্থ ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করি।'
রাতুল আরও বলেন, 'পরবর্তীতে আমি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে জানতে পারি যে, ঘটনার দিন বিজিবির কর্নেল রেদোয়ান, মেজর রাশেদ, রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমান এবং ওই এলাকার পুলিশের এডিসি গুলি করেন। পুলিশ ও বিজিবির আরও অনেক সদস্য ছিল, যাদেরকে আমি চিনি না। পরবর্তীতে আরও জানতে পারি যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ওবায়দুল কাদের এই গুলি বর্ষণের নির্দেশ প্রদান করেন।'
১৮ জুলাইয়ের ঘটনা উল্লেখ করে রাতুল বলেন, 'আমার বন্ধু রিফাত যখন গুলিবিদ্ধ হয়, তখন হেলিকপ্টারযোগেও প্রচুর গুলি করা হয়েছিল। আহত হয়ে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় জানতে পারি যে, ১৯ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত অনেকেই শহীদ হয়েছেন। তাদের মধ্যে সমুদ্র, রমজান, শাওন ও বাবু মোল্লা ছিলেন। তারা ছিলেন আন্দোলনকারী। রামপুরার ঘটনার মতো এমন ঘটনা ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত হয়েছে। আমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হইনি এবং কষ্ট করে যাচ্ছি। যারা গুলি বর্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং যারা গুলি বর্ষণ করেছেন, আমি তাদের বিচার চাই।'
উল্লেখ্য, এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে আছেন রেদোয়ানুল ইসলাম ও মো. রাফাত বিন আলম।
