হাতে গামছা বেঁধে হুক লাগিয়ে আমাকে মেশিনের মাধ্যমে ঝুলানো হয়: ট্রাইব্যুনালে গুমের ভুক্তভোগী
গুমের শিকার ডা. আশিক উল আকবর টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) থাকার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরে বলেন, একদিন তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়৷ জিজ্ঞাসাবাদ রুমে ঢুকিয়ে আমাকে প্রচুর মারধর করে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত মর্মে স্বীকার করতে বলে। আমি অস্বীকার করলে আমাকে আরও মারধর করে এবং আমার হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে হাতে একটি গামছা বাঁধে। গামছার সঙ্গে একটি হুক লাগিয়ে দেয় এবং আমাকে একটি মেশিনের মাধ্যমে ঝুলানো হয়। ঝুলানোর ফলে আমার ওজন বেশি থাকার কারণে আমার দুই হাতের বগলের নিচের চামড়া ছিঁড়ে যেতে থাকে।'
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি এসব কথা বলেন৷ এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী তাকে জেরা করেন।
জবানবন্দিতে ডা. আশিক উল আকবর বলেন, 'আমি একজন গুমের ভিকটিম। ২০১৬ সালে আমি রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলাম। আমি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী ছিলাম। তৎকালীন হাসিনা ও তার ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতাম। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ডাকে আমি শাপলা চত্বরে এসেছিলাম।'
তুলে নেওয়ার দিনের বর্ণনায় তিনি বলেন, '২০১৬ সালের ২৩ মে মামার বাড়ি টঙ্গী, গাজীপুরে থাকা অবস্থায় রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টায় আমি দরজার বাইরে প্রচণ্ড নক করার শব্দ পাই। দরজা খোলার পরে আমি ১০-১২ জন সাদা পোশাকধারীকে দেখতে পাই। তারা আমার নাম জিজ্ঞাসা করে। আমার নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা আমার মাথায় একটি পাতলা কালো কাপড় পরিয়ে মারধর করতে করতে আমাকে বাসা থেকে বের করে আনার সময় আমি একটি কালো মাইক্রো দেখতে পাই। তারা আমাকে মাইক্রোতে বসিয়ে চোখ শক্তভাবে বেঁধে জমটুপি পরিয়ে দেয়। আমার দুই পাশে দুইজন বসে আমার কোমরে শক্ত করে ধরে আমার পেছন থেকে আমাকে ধারাবাহিকভাবে মারতে থাকে।'
তারপর কাপড় দিয়ে ঘেরা একটি জায়গায় রাখা হয় উল্লেখ করে ডা. আশিক বলেন, 'সেখানে আমার দুই হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেওয়া হয়। আমার পরিধেয় কাপড়চোপড় খুলে পুরোনো একটি লুঙ্গি পরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তিন বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার খাওয়ার সময় এক হাতে হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হতো এবং চোখের বাঁধন কিছুটা ওপরে তুলে দিত। পেছনে একজন লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। সেখানে যা খাবার দেওয়া হতো, সেটাই খেতে হতো। কেউ খেতে না চাইলে প্রচুর মারধর করত। সেজন্য ভয়ে যা দেওয়া হতো, তা তাড়াতাড়ি করে খেতে হতো।'
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, 'তিন মিনিটের মধ্যে পায়খানা, প্রস্রাব ও গোসল শেষ করতে হতো। তিন মিনিটের বেশি হলে ওরা প্রচুর মারধর করত। তিন মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করে চোখ বেঁধে পেছনে ঘুরে দাঁড়াতে হতো এবং দরজায় নক করতে হতো। তখন তারা দরজা খুলে চোখের বাঁধন চেক করত এবং পুনরায় হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে যেখানে রাখা হতো, সেখানে নিয়ে যেত।'
তিনি আরও বলেন, 'সেখানে থাকা অবস্থায় আমাকে একদিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদ রুমে ঢুকিয়ে আমাকে প্রচুর মারধর করে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত মর্মে স্বীকার করতে বলে। আমি অস্বীকার করলে আমাকে আরও মারধর করে এবং আমার হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে হাতে একটি গামছা বাঁধে। গামছার সঙ্গে একটি হুক লাগিয়ে দেয় এবং আমাকে একটি মেশিনের মাধ্যমে ঝুলানো হয়। ঝুলানোর ফলে আমার ওজন বেশি থাকার কারণে আমার দুই হাতের বগলের নিচের চামড়া ছিঁড়ে যেতে থাকে। তখন পাশ থেকে একজন ফিসফিস করে বলছিল, স্যার, ও অনেক মোটা, মরে যাবে স্যার। তখন আমাকে ঝুলানো অবস্থা থেকে নামানো হয় এবং আমাকে পুনরায় জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হিসেবে স্বীকার করতে বলা হয়। আমি অস্বীকার করলে তারা বলে, তাদের কাছে এর থেকেও অনেক কিছু আছে, যা দিয়ে নির্যাতন করবে। আমি তার পরেও অস্বীকার করলে আমার দুই কানের লতিতে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। ইলেকট্রিক শক দেওয়ার সময় আমার মনে হয়, আমি মরে যাচ্ছি। তখন আমার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করি এবং আমি প্রচণ্ড ভয় পাই। তারপর আমি তাদের বলি, তারা যা বলবে আমি তাই স্বীকার করব।'
৬০ দিন পরে তিনিসহ আরও তিনজনকে র্যাব-১-এর মিডিয়া সেন্টারে এনে হাতের হ্যান্ডকাফ ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমি দেখতে পাই একটি ব্যাগে করে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, নাট-বল্টু ও বিভিন্ন প্রকার বই ব্যাগ থেকে বের করে একটি টেবিলের ওপরে সাজিয়ে রাখা হয় এবং আমাদেরকে টেবিলের পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে বলা হয়। তখন আমাদের ছবি তোলা হয়। জেলখানায় থাকা অবস্থায় আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় হুবহু সেই ছবি দেখতে পাই। এরপর পুনরায় আমাদের হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে চোখ বেঁধে র্যাব-১-এর বারান্দায় ফেলে রাখা হয়। ওই দিন আনুমানিক রাত ১০টার দিকে আমাদেরকে টঙ্গী থানায় নিয়ে আসা হয়। ওই সময় টঙ্গী থানায় থাকা ওসি আমার নাম শুনে কাকে জানি ফোন করে বলেন যে, স্যার, মুক্তিযোদ্ধার ছেলে আশিক উল আকবরকে আমরা খুঁজে পাই না, দেখেন স্যার, র্যাব তাকে দুই মাস রেখে এখন মামলা দিতে নিয়ে এসেছে। উনি মামলা নিতে অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে একটি ফোন আসায় তিনি মামলা গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালের ২১ জুলাই আমিসহ আরও তিনজন, মোট চারজনের বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় একই ঘটনায় তিনটি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি দুই মাস গুম এবং ১৩ মাস জেলে থাকার পরে হাইকোর্টের আদেশে জামিনে মুক্ত হই। এই ঘটনার ফলে আমার মেডিকেলে পড়াশোনা তিন বছর পিছিয়ে যায় এবং আমি ২০২৩ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করি। এ বিষয়ে আমি গুম কমিশনে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি। আমি আমার ওপর হওয়া এই ঘৃণ্য নির্যাতনের জন্য ফ্যাসিস্ট হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকী, তার ফ্যাসিস্ট রেজিমের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ওই সময়কার র্যাব সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।'
