নরসিংদীর কারখানাগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকট, কাঠ পুড়িয়ে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা
তীব্র গ্যাস সংকটে নরসিংদীর শতাধিক কারখানা তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় অন্তত ৫০টি কারখানার মালিক আংশিক উৎপাদন চালু রাখতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়াচ্ছেন।
সুতা প্রক্রিয়াজাতকারী সাইজিং কারখানাগুলো স্টিম বয়লার চালাতে কাঠ ব্যবহার করছে। প্রতিটি কারখানায় প্রতিদিন কাঠের পেছনে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে।
গতকাল (১৯ আগস্ট) চৌয়ালা শিল্প এলাকায় গিয়ে হক টেক্সটাইল ও ইউনিফিল টেক্সটাইল মিলে শ্রমিকদের স্টিম বয়লারে কাঠ পোড়াতে দেখা গেছে।
হক টেক্সটাইলের বয়লার অপারেটর মো. শাখাওয়াত বলেন, 'আগে আমরা বয়লার চালু করতে ঝুটকাপড় ব্যবহার করতাম। কিন্তু ঝুটকাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন কাঠ পোড়াচ্ছি।'
নরসিংদীর চৌয়ালা টেক্সটাইল শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসলাম ফকির টিবিএসকে জানিয়েছেন, গ্যাস ছাড়া সাইজিং ও ডাইং কারখানা চালানো সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, 'গত তিন দিন ধরে আমাদের কারখানাগুলোতে কোনো উৎপাদন হচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। কিছু কারখানা বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়াচ্ছে।'
উৎপাদন কমেছে ৭০% পর্যন্ত
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, নরসিংদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪ হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজারট টেক্সটাইল, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ও তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে।
প্রায় ৪০০টি কারখানা গ্যাসনির্ভর। স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য এসব কারখানায় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে নরসিংদীতে গ্যাস সংকট শুরু হলেও গত তিন দিনে তা তীব্র আকার ধারণ করেছে। গ্যাস সংকটে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এ সংকটে প্রতিদিন অন্তত ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
চৌয়ালার কয়েকটি টেক্সটাইল, ডাইং ও সাইজিং কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাস সংকটের কারণে অধিকাংশই বন্ধ রয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থায় যেসব কারখানা এখনও চালু রয়েছে, সেগুলোতে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। কোনো কোনো কারখানা মাত্র ১০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
মোমিন টেক্সটাইলের ১০ ইউনিটের সাতটিই বন্ধ
চৌয়ালা শিল্প এলাকার সবচেয়ে বড় এবং অন্যতম পুরোনো কারখানা মোমিন টেক্সটাইল মিলের ১০টি ইউনিটের মধ্যে সাতটি গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে।
রপ্তানিমুখী এই কারখানাটিতে প্রতিদিন ২২ হাজার থেকে ২৩ হাজার ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মিলছে মাত্র ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার ঘনফুট।
মিলটি শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে কাপড় রপ্তানি করে। প্রতিদিন ২৫ লাখ গজ কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ২০ হাজার গজে।
কারখানাটির আড়াই হাজার শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন বর্তমানে কর্মহীন রয়েছেন, কারণ কারখানাটি স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতে পারছে না। তবে শ্রমিকদের ধরে রাখতে তাদের বেতন দেওয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
মোমিন টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমান টিবিএসকে জানিয়েছেন, জুলাই পর্যন্ত কোম্পানিটি বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার পূরণ করতে পেরেছে।
তিনি বলেন, 'কিন্তু চলতি মাস থেকে আমরা সমস্যায় পড়েছি। এখনও আমাদের প্রায় ২০ লাখ গজ কাপড়ের অর্ডার রয়েছে, কিন্তু আমরা তা উৎপাদন করতে পারছি না।'
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহারের কথা বিবেচনা করছে কোম্পানিটি। তবে এতে প্রতি গজে উৎপাদন খরচ অন্তত আড়াই টাকা বাড়বে।
মাসুদুর রহমান বলেন, 'বিদেশি ক্রেতারা প্রতিনিয়ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইছেন। দ্রুত গ্যাস সংকটের সমাধান না হলে শিল্প খাত দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে।'
অন্যান্য কারখানাও শ্রমিকদের বাড়ি পাঠাচ্ছে
আল মদিনা টেক্সটাইল মিলের স্বত্বাধিকারী মো. ইরতাজুল ইসলাম জানান, তার কারখানা সাইজিং মিল থেকে প্রক্রিয়াজাত সুতা সংগ্রহ করে গ্রে কাপড় তৈরি করে। পরে সেই কাপড় ডাইংয়ের জন্য অন্য কারখানায় বিক্রি করা হয়।
তিনি বলেন, 'কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে সাইজিং মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আমরা সুতা প্রক্রিয়াজাত করতে পারছি না।'
তিনি আরও বলেন, 'আগে আমার কারখানায় প্রতিদিন ১ লাখ গজ উৎপাদন হতো। এখন ৩০ হাজার গজও উৎপাদন করতে পারছি না। বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের শিফট দুইটি থেকে কমিয়ে একটি করতে হয়েছে। লোকসান কমাতে আমাদের ১৫০ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১০০ জনকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বর্তমান গ্যাস পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় কারখানাটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।'
চাহিদার অর্ধেকের নিচে নেমেছে গ্যাস সরবরাহ
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের নরসিংদী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা কমপ্লেক্স এবং শিল্পকারখানায় জেলায় মাসে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৩ কোটি ঘনমিটার। তবে বর্তমান সংকটের কারণে সরবরাহ প্রয়োজনের অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের নরসিংদী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. মাকসুদুর রহমান টিবিএসকে জানান, সংকটের কারণে কারখানা মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না কোম্পানিটি।
তিনি বলেন, 'তবে আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।'
