প্রযুক্তির ব্যবহারে জন্মের আগেই জানা যাচ্ছে শিশুর নানা বৈশিষ্ট্য
মানবজীবনকে নানাভাবে রূপান্তরের পর যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি এখন মানুষের জন্মপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কাজ করছে। বেশ কিছু নতুন কোম্পানি এমন সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্ক্রিনিংয়ের সুবিধা দিচ্ছে, যার মাধ্যমে টেস্টটিউব (আইভিএফ) পদ্ধতিতে সন্তান নিতে আগ্রহীরা স্ত্রীর ভ্রূণের জিনগত ঝুঁকি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। যেমন, স্তন ক্যান্সার বা ডায়াবেটিসের মতো রোগের আশঙ্কা কতটা।
কিছু প্রতিষ্ঠান যেন কল্পবিজ্ঞানকেই সত্যি করেছে। ভ্রূণের সম্ভাব্য বুদ্ধিমত্তা (আইকিউ), উচ্চতা, এমনকি চোখ ও চুলের রঙের আনুমানিক হিসাবও করছে।
সমালোচকদের অনেকেরই আশঙ্কা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো সন্তান নিতে ইচ্ছুক দম্পতিদের ওপর এই 'অপরিপক্ক' প্রযুক্তি জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছে। আবার অনেকের মতে, এই প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তবুও এর প্রয়োগ অনৈতিক।
উভয় যুক্তির কোনোটিই পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ভ্রূণ স্ক্রিনিং পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা কিংবা এর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে একটি ভুল পদক্ষেপ।
আপাতত এই বিতর্ক সীমিত কিছু মানুষের মধ্যেই। এই স্টার্টআপ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ধনী, প্রভাবশালী বা একটু ব্যতিক্রমী স্বভাবের মানুষদেরই সেবা দেয়।
তবে দ্রুতই এ পরিস্থিতি বদলে যাবে। ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে আশা করা হচ্ছে আইভিএফ (টেস্টটিউব) চিকিৎসার খরচ অনেকটাই কমবে। একই সময়ে যদি ভ্রূণ পরীক্ষার সুযোগও দেওয়া হয়, তবে অনেক দম্পতিই তা গ্রহণ করবেন।
একটি জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকানদের চার ভাগের তিন ভাগই রোগ প্রতিরোধের জন্য ভ্রূণ পরীক্ষাকে সমর্থন করেন। আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ভ্রুণের রোগ ছাড়া অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহারের পক্ষে।
উন্নত বিশ্বের জেনেটিক্স ও প্রজনন চিকিৎসা সম্পর্কিত সংস্থাসহ অনেক চিকিৎসকই প্রশ্ন তুলছেন, পলিজেনিক বৈশিষ্ট্যের এমন আগাম বার্তা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য এখনো উপযুক্ত কি না।
ব্রিটেনে সন্তান জন্মদানের চিকিৎসা ব্যবস্থা আমেরিকার চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রিত। সেখানে সরকারের অনুমোদনহীন কোনো বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ভ্রূণ নির্বাচন করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
এই পুরো বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হওয়ার মতো সত্যিই বেশ কিছু কারণ রয়েছে। পলিজেনিক স্কোর হিসাব করা বেশ জটিল। একক জিনের কারণে হওয়া বহু রোগের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলাফল প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়। যদি একটি ভ্রূণে সেই নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকে, তবে তার রোগটি দেখা দেবেই।
কিন্তু একাধিক জিন মূল্যায়নের মাধ্যমে মূলত ঝুঁকির আনুমানিক হিসাব পাওয়া যায়, কোনো নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায় না। আর এই আনুমানিক হিসাবগুলো ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বেশি সঠিক হয়, কারণ জিনগত ডেটাবেসে তাদের তথ্যই বেশি রয়েছে।
আপেক্ষিক দিক থেকে ঝুঁকির হার কম বলে মনে হলেও, প্রকৃত বিচারে সেই হার খুবই সামান্য হতে পারে, বিশেষ করে বিরল রোগের ক্ষেত্রে। আবার কিছু নির্দিষ্ট গুণাগুণ নির্বাচন করতে গিয়ে অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
তবে এ কারণগুলো আইনি বিধিনিষেধের জন্য বা এ কাজ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পক্ষে কোনো যুক্তি নয়।
প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পলিজেনিক স্কোরিংয়ের সুবিধা দিতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই এ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে। পাশাপাশি তাদের উচিত নিজস্ব পরীক্ষাগুলোকে স্বাধীন পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়া।
এটি নতুন কোনো ব্যবসাকে ধ্বংস করে দেবে না। কারণ, সমালোচকদের দাবি অনুযায়ী, এই স্টার্টআপ কোম্পানিগুলো কোনো ভুয়া বা অকার্যকর ওষুধ বিক্রি করছে না।
২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় এক দশক পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে ১০টি ভ্রূণের মধ্য থেকে বেছে নিতে বাবা-মা তাদের সন্তানের উচ্চতা ১-৬ সেন্টিমিটার এবং আইকিউ ১-৭ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়িয়ে নিতে পারেন।
জিনগত ডেটাবেস যত উন্নত হবে, বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং এআই যত ভালোভাবে জিন ও বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক বের করতে পারবে, এই স্কোরগুলোর নির্ভুলতাও ততই বাড়বে।
এ ধরনের অগ্রগতি বেশ কিছু নৈতিক প্রশ্ন তুলবে। "মেক আমেরিকা হেলদি এগেইন" আন্দোলনের সমর্থকসহ অনেকেই মনে করেন, ফার্টিলিটি টেকনোলজি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
অনেকে আবার আশঙ্কা করেন, পলিজেনিক স্ক্রিনিং কেবল ধনীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তাদের সন্তানরা বাড়তি অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা পাবে। তবে সবচেয়ে ভীতিকর সমালোচনা হলো—ফার্টিলিটি উদ্যোক্তারা আসলে এই শতাব্দীর সুপ্রজননবিদ (ইউজেনিসিস্ট)।
তবে এই যুক্তিগুলোর কোনটিই সূক্ষ্ম বিচারে টেকে না। অনেক আধুনিক জন্মপদ্ধতিতে ইতোমধ্যেই 'অপ্রাকৃতিক' প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভ্রূণ নির্বাচনের বিরুদ্ধে এই যুক্তি আইভিএফ-এর ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। কেবল ধর্মান্ধরাই আইভিএফ নিষিদ্ধ করতে চায়।
প্রযুক্তির খরচ কমলে স্ক্রিনিং ব্যবস্থা আরও ব্যাপকভাবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও সহজলভ্য হবে। আর বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের সুপ্রজননবিদ্যার (ইউজেনিক্স) সাথে ভ্রূণ বাছাইয়ের সময় বাবা-মায়ের এই ভ্রুণ সম্পর্কে বেশি তথ্য জানার চেষ্টার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।
যে দম্পতিরা মেধাবী সন্তান পেতে ব্যাকুল তাদের বরং সন্তান জন্মের পরের বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে পরামর্শ দেওয়া উচিত। তবে, বাবা-মায়েরা যতক্ষণ পর্যন্ত বুঝবেন যে 'নিখুঁত শিশু' বলতে আসলে কিছু হয় না, ততক্ষণ পর্যন্ত ভ্রুণ সম্পর্কে এই অতিরিক্ত তথ্য পাওয়ার আগ্রহের পথে রাষ্ট্রীয় বাঁধা হয়তো অনুচিত।
