ইরান যুদ্ধে কুর্দি বাহিনী ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের, ভেস্তে দেন এরদোয়ান
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে বসে ইরানের নড়বড়ে সরকার ব্যবস্থা উৎখাতের সম্ভাব্য পথ তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন।
গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের বিপরীতে বসে নেতানিয়াহু সেদিন ইরানের সরকার পতনের জন্য কিছু উপায় তুলে ধরেন।
ওই বৈঠকে উপস্থিত এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, 'তিনি [নেতানিয়াহু] ট্রাম্পকে বলেছিলেন, আমরা যদি নির্দিষ্ট কয়েকটি কাজ করতে পারি, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ আছে, যেখানে ইরানি জনগণ নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারবে।'
নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মার্কিন বিমান সুরক্ষার অধীনে হাজার হাজার কুর্দি যোদ্ধাকে ইরানের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে তেহরানে পাঠানো।
মোসাদের তৈরি এবং সিআইএর সঙ্গে আলোচিত ওই অভিযানে ইরাকি কুর্দিস্তান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে কুর্দি যোদ্ধাদের দ্রুত ইরানে ঢুকিয়ে দেওয়া এবং একটি বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এর মাধ্যমে ইরানে তৎকালীন সরকার ব্যবস্থার চূড়ান্ত পতন ঘটানো ছিল লক্ষ্য।
তবে একটি বিষয় নেতানিয়াহুর হিসাবের বাইরে ছিল—তা হলো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।
এই অঞ্চলে সশস্ত্র কুর্দি বাহিনীর উপস্থিতির সম্ভাবনায় এরদোয়ান হস্তক্ষেপ করেন। পরে তিনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে গোপন ওই অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য করেন বলে দ্য টেলিগ্রাফ জানতে পেরেছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'কিছু শর্ত পূরণ হয়নি এমন কিছু কারণে, যেগুলো নিয়ে আমি বিস্তারিত বলতে চাই না।' এর মাধ্যমে তিনি ব্যর্থ পরিকল্পনাটির দিকে ইঙ্গিত করেন।
ইসরায়েলি ও উপসাগরীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ বিশ্বনেতাদের একজন এরদোয়ান সেসময় ট্রাম্পকে বলেছিলেন, তিনি এই অঞ্চলের কোথাও কুর্দিদের স্বাধীনতা মেনে নেবেন না।
কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে কয়েক দশকের পুরোনো আশঙ্কা থেকেই এরদোয়ানের এই আপত্তির জন্ম।
৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তুরস্ক কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে-র বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এটি একটি কুর্দি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন। এই সংঘাতে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ গেছে।
কুর্দিরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রহীন জাতিগোষ্ঠী। তারা মূলত ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কে বিভক্ত। এসব দেশে তাদের অনেকে গুরুতর বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
ইসরায়েল সক্রিয়ভাবে কুর্দিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে, কুর্দিরা এমন একটি সম্ভাবনাময় অস্থিতিশীল শক্তি, যাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানো যেতে পারে।
ইরানের কুর্দিরা শাহের আমলে এবং পরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আমলেও নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
পরিকল্পনাটি জানতে পেরে এরদোয়ান আশঙ্কা করেন, কুর্দি মিলিশিয়াদের অস্ত্র দিলে তার রাজনৈতিক শত্রুদের একটি বড় অংশ অস্ত্রধারী ও বিপজ্জনক হয়ে তুরস্কের পূর্ব সীমান্তে অবস্থান নেবে। এমন ঝুঁকি নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
এরদোয়ানের হস্তক্ষেপের কারণে ইরানের সরকার পরিবর্তনের অন্যতম উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা ব্যর্থতার মুখে পড়ে। এই পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এমন এক যুদ্ধ শুরু করেছে, যা এখন জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে।
যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইতোমধ্যে দুবার ইরানের সরকার পরিবর্তন হয়েছে এবং নতুন সরকার আগের সরকারগুলোর তুলনায় অনেক বেশি 'যৌক্তিক'।
তবে ট্রাম্প আরও বলছেন, ইরানের সরকার পরিবর্তন তার প্রধান লক্ষ্য ছিল না। এই যুদ্ধ নিয়ে তার অবস্থান ও মূল লক্ষ্য বার বার বদলেছে। কখনো তিনি বলেছেন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া তার প্রধান লক্ষ্য, কখনো বা বলেছেন ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করাই তার মূল চাওয়া আবার কখনো বলেছেন ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করাই তার মূল লক্ষ্য।
সিচুয়েশন রুমের বৈঠকের পর মার্কিন কর্মকর্তারা মূল্যায়ন করেন, নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার কিছু অংশ ছিল বাস্তবতা বিবর্জিত। এর মধ্যে কুর্দিদের ইরানে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা অন্যতম বলে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে।
সিআইএ-র পরিচালক জন র্যাটক্লিফ যখন ট্রাম্পকে এ বিষয়ে অবহিত করেন, তখন নেতানিয়াহুর বলা ইরানের সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনাকে 'হাস্যকর' বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তবে ট্রাম্প শেষ অবধি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনাই অনুসরণ করেন।
১ মার্চ তিনি কুর্দি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তেহরানের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পারেন এমন স্থানীয় কর্মকর্তাদেরও এ বিষয়ে রাজি করানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।
অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে ইসরায়েল পশ্চিম ইরানে হামলা চালায়। এসব হামলায় শাসকগোষ্ঠীর কর্মকর্তাদের অবস্থান, সেনাঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, পুলিশ স্টেশন ও বাসিজের স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এতে ধারণা তৈরি হয়, ইসরায়েল হয়তো কুর্দিদের অগ্রযাত্রার পথ তৈরি করছে।
ইরাকি কুর্দিস্তান থেকে চালানো ওই হামলায় ইরানের কুর্দিদের ছয়টি সংগঠনের যোদ্ধারা অংশ নেবে বলে খবর প্রকাশিত হয়। পরে তারা ইরানের ভেতরে থাকা কুর্দিদের অস্ত্র সরবরাহ করবে।
১৮ মার্চ ওই সশস্ত্র জোট ইরানে ঢোকার জন্য প্রস্তুত ছিল। তাদের প্রয়োজন ছিল শুধু ট্রাম্পের অনুমোদন।
যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে খাবাত অর্গানাইজেশনের মহাসচিব বাবাশেখ হোসেইনি দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, 'আমরা এই যুদ্ধে না গেলে হয়তো ইরানের সরকারের পতন ঘটবে না, অথবা ঘটলেও তা অনেক দেরিতে ঘটবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের বাহিনী যদি যুদ্ধে থাকত এবং আমরা রোজহেলাতের জনগণকে বিদ্রোহে নামার আহ্বান জানাতাম, তাহলে এতক্ষণে সরকার পতন আরও অনেক কাছাকাছি চলে আসত।'
এর মধ্যেই কুর্দিরা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিজেদের উপস্থিতি নিয়ে দরকষাকষি শুরু করে। শুধু সামরিক সহায়তা নয়, তারা 'রাজনৈতিক নিশ্চয়তা'ও দাবি করতে থাকে।
এই পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পরপরই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেতে শুরু করে।
মার্চে ফক্স নিউজ জানায়, একটি অভিযান শুরু হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হোয়াইট হাউসের তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট নিজেদের অবস্থান ব্যাখা করে বলেন, এই উদ্দেশ্যে [ইরান যুদ্ধে কাজে লাগানো] যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের অস্ত্র দিচ্ছে না।
এ সময়ে এরদোয়ান ওয়াশিংটনকে পরিকল্পনাটি বাতিল করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন বলে জানা যায়। উপসাগরীয় দেশগুলোও সতর্ক করে বলেছিল, ইরানকে জাতিগতভাবে বিভক্ত করা হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হওয়ায় জেরুজালেমে অসন্তোষ দেখা দেয়। মোসাদের পরিচালক রোমান গোফম্যান সংস্থাটির সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে দুজনকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা ইরানের সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন।
২৮ জুলাই ওভাল অফিসে সর্বশেষ বৈঠকে আবারও ইরানের সরকার পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে আসে বলে দ্য টেলিগ্রাফকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নেতানিয়াহু জানিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে এখনও সরকার পরিবর্তন সম্ভব। তবে তিনি ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত রাজি করাতে ব্যর্থ হন বলে মনে হয়।
ট্রাম্প হামলা চালানোর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর পথ বেছে নেন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন, তার প্রায় সবই ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের সরকার পরিবর্তনকে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটিও ব্যর্থ হয়েছে।
