ধারণক্ষমতার তিনগুণ বন্দি, চট্টগ্রামে নতুন তিন কারাগারের প্রস্তাব
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ধারণক্ষমতার সংকট নিরসন এবং বিভিন্ন ধরনের বন্দির মধ্যে অপরাধের কৌশল ও যোগাযোগ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চট্টগ্রামে তিনটি নতুন কারাগার স্থাপন এবং কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য পৃথক বন্দিশালা নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা কর্তৃপক্ষ।
একই সঙ্গে মাদক মামলার বন্দি, মহানগর এলাকা ও জেলার অন্যান্য এলাকার বন্দিদের আলাদা রাখতে পৃথক বিশেষায়িত অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
নতুন কারাগারগুলোর জন্য পটিয়া, কর্ণফুলী বা আনোয়ারায় ৫০ থেকে ৭০ একর সরকারি জমি অধিগ্রহণ বা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বন্দিদের কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর প্রয়োজন কমবে। আর বিদ্যমান কেন্দ্রীয় কারাগারে উত্তর চট্টগ্রামের বন্দিদের রাখা যাবে।
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. ছগির মিয়া সম্প্রতি কারা মহাপরিদর্শক ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাঠানো দুটি পৃথক চিঠিতে এসব প্রস্তাব ও সুপারিশ করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে গাজীপুরে চারটি এবং কেরানীগঞ্জে তিনটি নতুন কারাগার উদ্বোধন করা হয়।
তবে একই সময়ে জনসংখ্যা ও অপরাধপ্রবণতা বাড়লেও দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে বন্দিদের জন্য নতুন কোনো কারাগার নির্মাণ করা হয়নি।
বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শকের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে ১৮৮৫ সালে চট্টগ্রাম শহরের লালদিঘীর পাহাড়ের ওপর ১৪ দশমিক ৪০ একর জমিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মিত হয়। পরে দেশের জনসংখ্যা ও বন্দির সংখ্যা বাড়ায় ১৯৯০ সালে কারাগারের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ধারণক্ষমতা বাড়াতে প্রকল্প নেওয়া হয়।
ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ বন্দি নিয়ে চলছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার। ২ হাজার ২৪৯ জন বন্দির ধারণক্ষমতার এই কারাগারে প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজারের বেশি বন্দি থাকছেন। মোট হাজতি বন্দির প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই মাদকসংক্রান্ত মামলার আসামি।
জায়গার অভাবে কারা প্রশাসন ও বন্দি—উভয়েই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অতিরিক্ত বন্দির চাপের সঙ্গে রয়েছে তীব্র জনবল সংকট। কারাগারটিতে বর্তমানে একজন সিনিয়র জেল সুপার, একজন জেলার, তিনজন ডেপুটি জেলার, ১৫ জন প্রধান কারারক্ষী, ৩০ জন সহকারী প্রধান কারারক্ষী, ৩৫১ জন কারারক্ষী ও ১১ জন নারী কারারক্ষী কর্মরত আছেন।
নতুন তিন কারাগারের প্রস্তাব
মহানগর ও জেলা বিচারব্যবস্থা পৃথক হওয়ার পরও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে মহানগর, জেলা ও মাদক মামলার বন্দিদের একসঙ্গে রাখা হচ্ছে।
কারা কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন ধরনের বন্দিকে একসঙ্গে রাখায় তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও অপরাধের নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার পাশাপাশি অপরাধের কৌশল একে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে তিনটি নতুন কারাগার নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
বিপুলসংখ্যক মাদকাসক্ত ও মাদক ব্যবসায়ীদের আলাদা রেখে যথাযথ চিকিৎসা ও মানসিক পুনর্বাসনের জন্য চট্টগ্রাম শহরের কাছাকাছি ৫০ থেকে ৭০ একর জমিতে 'চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২' নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি মাদক মামলার বন্দিদের জন্য বিশেষায়িত কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
কারা কর্তৃপক্ষের মতে, শহরের কাছাকাছি এই বিশেষায়িত কারাগার স্থাপন করা গেলে চিকিৎসা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও পুনর্বাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সেবা সহজে পাওয়া যাবে।
একইভাবে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার বন্দিদের জন্য পৃথক 'চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-৩' নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, শহরের অপরাধীরা সাধারণত অস্ত্র, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জাল টাকা তৈরি, দালালি ও চোরাকারবারের মতো তুলনামূলক জটিল ও সংঘবদ্ধ অপরাধে যুক্ত থাকে। বর্তমানে মহানগর এলাকার বন্দির সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার, যাদের বেশিরভাগই হাজতি। শহরের দ্রুত সম্প্রসারণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অন্তত ২০০ একর সরকারি খাস জমিতে এই বিশেষায়িত কারাগার নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ও বিচারিক সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে 'চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-৪' নির্মাণেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। পটিয়া, বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলার আদালতে বিচারাধীন সাধারণ বন্দিদের জন্য এই পৃথক কারাগার নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা কারাগারের প্রস্তাব
কক্সবাজার জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা প্রায় ৮৫০ জন হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ বন্দি রয়েছেন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ বন্দি কারাগারটিতে অবস্থান করছেন।
মোট বন্দির মধ্যে প্রায় ৪৫০ জন রোহিঙ্গা, মিয়ানমার ও ভারতীয় নাগরিকসহ অন্যান্য বিদেশি বন্দি। তাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। অর্থাৎ কক্সবাজার জেলা কারাগারের প্রায় ১৭ শতাংশ বন্দি বিদেশি। বাকিরা বাংলাদেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা ও বিদেশি বন্দিদের জন্য আলাদা ব্লক থাকলেও কারাগারের সীমিত পরিসরের কারণে দিনের বিভিন্ন সময়ে তাদের অন্য বন্দিদের সঙ্গে মেলামেশা হয়। এতে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও আচরণগত প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে। রোহিঙ্গা বন্দিদের অপরাধের ধরন সাধারণ বাংলাদেশি বন্দিদের তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় একসঙ্গে থাকার কারণে তাদের অপরাধপ্রবণ আচরণের কিছু প্রভাব অন্যদের ওপর পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার ওবায়দার রহমান টিবিএসকে বলেন, "অতিরিক্ত বন্দির চাপ কারাগার পরিচালনায় বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কারাগারের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হলে বন্দিদের আবাসন ও কারা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।"
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. ছগির মিয়া টিবিএসকে বলেন, "মাদক মামলার বন্দিদের জন্য একটি আলাদা জোন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মহানগর এলাকার বন্দিদের জন্যও পৃথক ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরোনো কারাগারটিতে চট্টগ্রাম জেলার বন্দিদের রাখা হবে। এতে বিভিন্ন ধরনের বন্দিরা আলাদা থাকবে এবং তাদের মধ্যে যোগাযোগ বা পরামর্শের সুযোগ কমবে। ফলে অপরাধও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। মহানগরের বন্দিদের স্থানান্তরের জন্য জঙ্গল সলিমপুরে নতুন কারাগার নির্মাণের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।"
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়া উদ্দিন টিবিএসকে বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপ, বিভিন্ন শ্রেণির বন্দিদের একসঙ্গে রাখার জটিলতা এবং এর ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার সমস্যা নিয়ে একাধিকবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভায় আলোচনা হয়েছে। নতুন সরকার কারাগার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম কারাগারের ধারণক্ষমতার সংকট নিরসনে নতুন কারাগার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা এবং জমিসংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনও প্রয়োজনীয় কাজ করছে।
তিনি বলেন, "রোহিঙ্গা, মাদকসংশ্লিষ্ট এবং অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত বন্দিদের পৃথকভাবে রাখার ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাবও সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে। প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে পরবর্তী করণীয় জানানো হবে।"
নতুন কোনো কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলতে পারবে। তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা আসেনি।"
জঙ্গল সলিমপুরে নতুন কারাগার স্থাপনের অগ্রগতি সম্পর্কে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, "সম্ভাব্য জমি চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেখানো হয়েছে। তবে সেখানে একটি মামলা চলমান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসনের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। এ কারণে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত করা যায়নি। জেলা প্রশাসন পুনর্বাসনের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে নতুন কারাগার স্থাপনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।"
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, বিশ্বে কারাগারকে শুধু শাস্তি দেওয়ার জায়গা হিসেবে নয়, বরং সংশোধনাগার হিসেবে দেখা হয়। কারাগারে থাকা সবাই দণ্ডপ্রাপ্ত নন; তাদের বড় একটি অংশ বিচারাধীন এবং অনেকেই পরে খালাস পান। তাই বিচার শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা বা সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে আচরণ করা আইন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী।
তিনি বলেন, "একজন বন্দি যেন পর্যাপ্ত জায়গায় ঘুমাতে পারেন, গোসল করতে পারেন এবং মানবিক পরিবেশে থাকতে পারেন—এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ কারাগার ধারণক্ষমতার অনেক বেশি বন্দি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে বন্দিদের অমানবিক পরিবেশে থাকতে হচ্ছে। এ সংকট কাটাতে নতুন কারাগার নির্মাণ এবং বিদ্যমান কারাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।"
তিনি আরও বলেন, "ব্রিটিশ আমলে নির্মিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে বর্তমান চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে কারাগারের অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও বন্দিদের মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।"
