আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে চট্টগ্রামে প্রতিদিন ১,০০০ টন বর্জ্য থেকে যাচ্ছে সংগ্রহের বাইরে
চট্টগ্রামে প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন বর্জ্যের মধ্যে প্রায় ১ হাজার টনই সংগ্রহ করা হচ্ছে না। পুরোনো যন্ত্রপাতি, জনবল সংকট এবং বর্জ্য ফেলার পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।
সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করতে পারে সিটি করপোরেশন।
তিনি বলেন, "সংগ্রহ না হওয়া বর্জ্যের একটি অংশ সড়ক, নালা, খাল ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। এতে জলাবদ্ধতা, দূষণ ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।"
২৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায়
বর্জ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সরঞ্জাম কেনার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২৯৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বর্তমানে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জানান, প্রকল্পটি প্রথমে প্রায় ৩ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পর্যালোচনার পর ব্যয় কমিয়ে ২৯৮ কোটি টাকা করা হয়। সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্প ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ সিটি করপোরেশন এবং বাকি অংশ সরকার বহন করবে।
তিনি বলেন, "সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ যন্ত্রপাতিই প্রায় ২৫ বছরের পুরোনো। নতুন যন্ত্রপাতি কেনার ২৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।"
তবে প্রকল্প ব্যয়ের নিজস্ব অংশ বহনের আর্থিক সক্ষমতা সিটি করপোরেশনের নেই বলে জানান ইখতিয়ার।
তিনি বলেন, "প্রকল্পের পুরো ব্যয় যেন সরকার বহন করে, সে বিষয়ে মেয়র সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন।"
তিনি আরও জানান, দুই থেকে তিন বছর আগের বাজারদরের ভিত্তিতে প্রকল্পটি সাজানো হয়েছিল। ফলে বাস্তবায়নের আগে যন্ত্রপাতির ব্যয় নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ দেলোয়ার মজুমদার বলেন, সিটি করপোরেশনের পুরোনো যন্ত্রপাতির সক্ষমতা কমে আসায় প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন করা প্রয়োজন। তবে শুধু নতুন যন্ত্রপাতি কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
এ জন্য জনসচেতনতা বাড়ানো, বর্জ্য উৎপাদনের স্থানেই আলাদা করা এবং যথাযথভাবে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত ও পুনর্ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায় শুধু নগরবাসীর ওপর চাপালে হবে না।
তিনি বলেন, "সিটি করপোরেশন ও তাদের ঠিকাদাররা যথাযথভাবে বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও অপসারণ করছে কি না, সে বিষয়েও তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।"
নাজের হোসাইন বলেন, নালা থেকে তোলা বর্জ্য দ্রুত সরানো না হলে তা আবার নালা বা জলাশয়ে ফিরে যেতে পারে। একইভাবে খোলা ট্রাকে বর্জ্য পরিবহনের কারণে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি বায়ুদূষণও হয়।
৩ হাজার ২৩৭ কর্মী, তবু সংগ্রহে ঘাটতি কেন?
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নিজস্ব ৩ হাজার ২৩৭ জন কর্মী কাজ করছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৬৯ জন। অর্থাৎ প্রায় এক বছরের ব্যবধানে নিজস্ব জনবল কমেছে ৩২ জন।
চসিক কর্মকর্তারা জানান, কর্মীদের অবসর ও ছাঁটাইয়ের কারণে জনবল কমেছে। সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন করে জনবলও বাড়ানো হচ্ছে না। তবে তাদের মতে, বর্জ্য সংগ্রহে বর্তমান ঘাটতির মূল কারণ শুধু জনবল সংকট নয়; পুরোনো যানবাহন ও যন্ত্রপাতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা।
নগরীর কিছু এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহে বেসরকারি ভেন্ডরদেরও যুক্ত করা হয়েছিল। একপর্যায়ে ৪১টি ওয়ার্ডে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাসাবাড়ি থেকে ডোর-টু-ডোর বর্জ্য সংগ্রহ করা হতো। এ জন্য ভেন্ডররা প্রতিটি বাসাবাড়ি থেকে মাসে ৭০ টাকা করে নিতেন।
তবে এ ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত ফল না আসায় এখন ২৫টি ওয়ার্ডে চসিকের নিজস্ব অর্থায়নে বিনামূল্যে ডোর-টু-ডোর বর্জ্য সংগ্রহ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ৪ আগস্ট নগর ভবনে চসিকের সার্বিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গঠিত কমিটির দশম সভায় ২৫টি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে বিনামূল্যে ডোর-টু-ডোর বর্জ্য সংগ্রহের ঘোষণা দেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, শুরুতে ১০টি ওয়ার্ডে এ সেবা চালুর পরিকল্পনা ছিল। পরে মেয়রের নির্দেশনায় তা বাড়িয়ে ২৫টি ওয়ার্ড করা হয়েছে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহের বাইরে থাকায় নগরবাসীর একটি অংশ যত্রতত্র বর্জ্য ফেলছেন। এতে নালা-নর্দমা ভরাট হচ্ছে, জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে এবং কর্ণফুলী নদীর দূষণ বাড়ছে।
তিনি বলেন, "বিনামূল্যে বর্জ্য সংগ্রহে বছরে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।"
এদিকে ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার বলেন, "শুধু নতুন যন্ত্রপাতি পেলেই হবে না। মানুষকেও নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলতে হবে। অনেকেই এখনো রাস্তায়, ড্রেনে ও খালে বর্জ্য ফেলছেন। এসব বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থায় না এলে অপসারণও সম্ভব নয়।"
প্রায় পূর্ণ ল্যান্ডফিল, প্রতিদিন ঢুকছে ৭০ গাড়ি
বর্জ্য সংগ্রহের পর তা ফেলার জায়গার সংকটও চসিকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার বলেন, বর্তমান ল্যান্ডফিল প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য জমতে জমতে সেখানে বড় বড় স্তূপ তৈরি হয়েছে। এতে আশপাশের বাসিন্দাদের আপত্তিও বাড়ছে।
তিনি বলেন, "প্রতিদিন প্রায় ৭০টি বর্জ্যবাহী গাড়ি ল্যান্ডফিলে প্রবেশ করছে। জায়গার সংকটের কারণে সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। পুরোনো ডাম্পিং ব্যবস্থার পরিবর্তে আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।"
সরেজমিনে দেখা গেছে, চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে প্রধানত দুটি উন্মুক্ত ডাম্পিং বা ট্রেঞ্চিং গ্রাউন্ড—বায়েজিদের আরেফিন নগর ও হালিশহরের আনন্দবাজার—ব্যবহৃত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সনাতন পদ্ধতিতে বর্জ্য ফেলায় দুই কেন্দ্রেই ময়লার বড় বড় স্তূপ জমেছে।
দুই ডাম্পিং কেন্দ্রের কোনোটিতেই আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা বা লিচেট শোধনাগার নেই। ফলে বর্জ্য থেকে নির্গত দুর্গন্ধ ও দূষিত তরল আশপাশের ড্রেন-খাল হয়ে কর্ণফুলী নদীতে মিশছে।
এ পরিস্থিতিতে বায়েজিদ ও হালিশহরের বিদ্যমান দুটি ডাম্পিং কেন্দ্রকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে চসিক। পাশাপাশি ফতেয়াবাদসহ নতুন এলাকায় ল্যান্ডফিল নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াও চলছে।
স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে কোরিয়ার সহযোগিতা চায় চসিক
চট্টগ্রামে পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানের স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণে দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতা চেয়েছে চসিক।
গত ৬ আগস্ট কোরিয়া এনভায়রনমেন্টাল ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের (কেইআইটিআই) নিযুক্ত পরামর্শক হং ও চোয়ে চসিক কার্যালয়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রস্তাবিত স্যানিটারি ল্যান্ডফিল প্রকল্পের সম্ভাবনা, বাস্তবায়ন কৌশল ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে মেয়র সাংবাদিকদের বলেন, "আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। পরিবেশ রক্ষা এবং নাগরিকদের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানের স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।"
তিনি বলেন, "আমরা একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও টেকসই চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে কাজ করছি। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা উন্নত হবে না, পরিবেশ সংরক্ষণ, সম্পদ পুনরুদ্ধার ও পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।"
চসিকের তথ্যমতে, বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের দূতাবাসের সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত মে মাসে ইআরডি প্রকল্পটির জন্য কোরিয়া দূতাবাসে আনুষ্ঠানিক সহায়তার অনুরোধপত্র পাঠিয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের বিদ্যমান দুটি উন্মুক্ত ডাম্পিং সাইট পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে পরিবেশসম্মতভাবে পুনর্বাসন করা হবে। একই সঙ্গে সম্পদ পুনরুদ্ধার ও পুনর্ব্যবহারকে গুরুত্ব দিয়ে একটি আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাসের পরিকল্পনা
চসিকের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বর্জ্যকে শুধু অপসারণযোগ্য বস্তু হিসেবে না দেখে সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও রয়েছে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, "অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হবে।"
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে নগরীতে উৎপাদিত বর্জ্যের পুরোটা সংগ্রহব্যবস্থার আওতায় আনা এবং যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা জরুরি।
