সাম্প্রতিক বোমা আতঙ্কের নেপথ্যে নব্য জেএমবির ‘বোমারু মামুন’, বলছে পুলিশ
রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ ও বোমা উদ্ধারের ঘটনায় সামনে এসেছে নাজমুল হাসান মামুন ওরফে 'বোমারু মামুন' নামটি। পুলিশের দাবি, নব্য জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই ব্যক্তি বোমা তৈরিতে পারদর্শী এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৯ বছর আগে মাত্র ২১ বছর বয়সে বোমা তৈরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মামুন। ২০১৭ সালে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিওতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনাতেও তার বানানো বোমা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ওই বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নামে এক তরুণ নিহত হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে বেরিয়ে আসেন মামুন।
১৯৯৭ সালে বরিশালে জন্মানো মামুন ঢাকার উত্তরার একটি কলেজে পড়াশোনা করেছেন। মিরপুরে আব্দুল্লাহ নামের নব্য জেএমবির এক সদস্যের কাছে তিনি বোমা তৈরি শেখেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। এক সময় রাস্তার পাশে আতরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় জিনিসপত্র বিক্রি করতেন তিনি।
তবে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে 'হোটেল ওলিও' মামলায় মামুনসহ সব আসামিকে খালাস দেন ঢাকার একটি আদালত। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত তাদের 'বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী নেতা-কর্মী' হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপর রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ধারাবাহিকভাবে বোমা বিস্ফোরণ ও বোমা উদ্ধারের ঘটনায় আবারও আলোচনায় আসে মামুনের নাম।
সিটিটিসি প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, 'দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা ও বোমা সদৃশ বস্তু উদ্ধারের পর থেকেই এসব ঘটনার নেপথ্যের কারিগরদের শনাক্তের চেষ্টা শুরু করে সিটিটিসি। আরিফকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে এসব ঘটনায় মামুনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। মামুনকে গ্রেপ্তারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।'
একের পর এক ঘটনায় মামুনের নাম
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লা, সায়েদাবাদ, মতিঝিল ও আশুলিয়ায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় মামুন ও তার সহযোগী আরিফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর ফেব্রুয়ারিতে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের তল্লাশির সময় এক ব্যক্তি পুলিশকে ছুরিকাঘাত করে বোমাভর্তি একটি ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যায়। মার্চে কুমিল্লার একটি শিব মন্দিরে বিস্ফোরণ এবং একই মাসে সায়েদাবাদে পুলিশের তল্লাশির সময় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ বলছে, এসব ঘটনার পর থেকেই মামুনকে খুঁজছিল তারা।
সর্বশেষ গত জুলাইয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের 'উল্টো রথযাত্রার' পথে মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতরে একটি 'পাইপ বোমা' রেখে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে আশুলিয়ার চারাবাগে একটি চায়ের দোকানে 'প্রেশার কুকার বোমা' ফেলে রাখা হয়। পুলিশের ভাষ্য, এসব ঘটনায়ও মামুন-আরিফ চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
আরিফ গ্রেপ্তারের পর নতুন তথ্য
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তদন্তে নতুন মোড় আসে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আরিফকে গ্রেপ্তারের পর। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের পর সাভারের শ্যামপুরে তার আস্তানায় অভিযান চালায়। সন্ধ্যা থেকে বাড়িটি ঘিরে রেখে রাত পৌনে ২টা পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়। সিটিটিসির দাবি, ওই আস্তানা থেকে ১৩টি পাইপ বোমা ও বোমা তৈরির বিভিন্ন রাসায়নিক উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই সাম্প্রতিক কয়েকটি বোমা ও বিস্ফোরণের ঘটনায় 'বোমারু মামুনের' সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সাভারে ফের মিলল প্রেশার কুকার বোমা
মামুনকে ঘিরে তদন্তের মধ্যেই বুধবার সকালে সাভারের গোপেরবাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের সামনের একটি মাঠ থেকে আরও একটি 'প্রেশার কুকার' বোমা উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, মঙ্গলবার রাত থেকে মাঠের পাশে একটি নীল রঙের ড্রাম পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে সেটির ভেতর থেকে বোমাটি পাওয়া যায়।
একদিকে আরিফের আস্তানা থেকে বিপুলসংখ্যক বোমা ও বোমা তৈরির রাসায়নিক উদ্ধার, অন্যদিকে পরদিনই আরও একটি প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধারের ঘটনায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
নয় বছর পর আবার কেন আলোচনায় 'বোমারু মামুন'?
মাত্র ২১ বছর বয়সে বোমা তৈরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া মামুনের নাম ২০১৭ সালের হোটেল ওলিও বিস্ফোরণের পর ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিল। সেই মামলায় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি পুরোপুরি খালাস পান সেই মামলা থেকে ।
কিন্তু খালাসের কয়েক মাসের মধ্যেই রাজধানী ও আশপাশে ধারাবাহিক বোমা উদ্ধারের ঘটনায় তার নাম সামনে আসায় তদন্তকারীদের নজর আবার তার দিকে।
পুলিশের দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর 'নাটের গুরু' মামুন। তার সহযোগী হিসেবে আরিফের নামও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মামুনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
১২ আগস্ট দুপুরে আরিফকে গ্রেপ্তার ও সাভারের অভিযানের বিস্তারিত জানাতে সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল সিটিটিসির। তবে, দুপুর সোয়া ১২টার দিকে খুদে বার্তার মাধ্যমে সেই সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের কথা জানানো হয়।
