কারিকুলাম বদল, করোনার শিক্ষাক্ষতি—এসএসসিতে পাসের হার কমার নেপথ্যে যেসব কারণ
মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এই ধসের কারণ নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন—যার মধ্যে রয়েছে কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির বারবার পরিবর্তন, করোনা মহামারির জেরে পড়াশোনার ক্ষতি এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের দুর্বলতা। এ ছাড়া অনেকের মতে, এবার পরীক্ষা অনেক বেশি কঠোর ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়াও পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হতে পারে।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২.২৫ শতাংশ, যা ২০০৭ সালের ৫৭.৩৭ শতাংশের পর গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে পাসের হার ছিল ৮৮.২৯ শতাংশ, অর্থাৎ গত এক দশকে পাসের হার ২৬.০৪ শতাংশ কমেছে।
কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির বারবার পরিবর্তনের মধ্যে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের আগের মতো লিখিত পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা নবম শ্রেণিতে একটি সম্পূর্ণ নতুন কারিকুলাম এবং ভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতির অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে পুনরায় তাদের লিখিত পরীক্ষা-ভিত্তিক পদ্ধতিতে ফিরে আসতে হয়। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের ধারণা, অনেক শিক্ষার্থী এই সনাতন লিখিত পরীক্ষার কাঠামোর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খেয়েছে।
নতুন কারিকুলামের অধীনে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য এবারের এসএসসি পরীক্ষাটি ছিল অনেকখানিই নতুন অভিজ্ঞতা। ২০২২ সালে মাধ্যমিক স্তরে পরীক্ষা-বিহীন একটি মূল্যায়ন-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, যেখানে প্রচলিত পরীক্ষার চেয়ে ব্যবহারিক ও যোগ্যতা-ভিত্তিক শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া করোনা মহামারির কারণে এই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পঞ্চম শ্রেণিতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষাতেও বসতে পারেনি।
তবে ২০২৬ সালে সরকার পরিবর্তনের পর নেওয়া নতুন সিদ্ধান্তের ফলে মাধ্যমিক শিক্ষার শেষে তাদের পুনরায় লিখিত পরীক্ষা-ভিত্তিক পদ্ধতিতে ফিরিয়ে আনা হয়। শিক্ষকদের মতে, ব্যবহারিক ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন থেকে হঠাৎ করে প্রথাগত লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার এই বড় পরিবর্তনটি শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল।
ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উর্মি ইসলাম এমা বলেন, 'যেহেতু তারা এর আগে কখনো কোনো বোর্ড পরীক্ষায় বসেনি এবং ব্যবহারিক-ভিত্তিক কারিকুলামে অভ্যস্ত ছিল, তাই কিছু শিক্ষার্থী হয়তো নতুন এই লিখিত পরীক্ষা পদ্ধতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সমস্যায় পড়েছে।'
তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাজেদা মুজিব বলেন, কারিকুলাম পরিবর্তনের পাশাপাশি করোনা মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও এই ব্যাচটিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তিনি বলেন, 'একই সাথে, শিক্ষকেরাও নতুন কারিকুলামের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুত ছিলেন না।' এর ফলে যখন পুরো ব্যবস্থাটি হঠাৎ করে লিখিত ও সৃজনশীল পরীক্ষায় ফিরে আসে, তখন শিক্ষার্থীরা দ্রুত তার সাথে মানিয়ে নিতে চরম সমস্যার মুখে পড়ে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে গতকাল শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেন, 'আমরা একটি ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার সাথে কাজ করছি। গত ২০ বছরে আমরা আরও পিছিয়ে পড়েছি। শিক্ষকদের ঘাটতি আশঙ্কাজনক।'
ক্লাসরুমের পাঠদান ও শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল কারিকুলাম ও পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনকেই এই খারাপ ফলাফলের একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। ফলাফল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ক্লাসরুমের পাঠদানের মান, শিক্ষকদের যোগ্যতা, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি এবং করোনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, এই প্রবৃদ্ধির অবনতির পেছনে একাধিক কারণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, 'স্কুলগুলোতে পাঠদানের অবস্থা এবং শিক্ষকদের দক্ষতাও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আমাদের গবেষণা দেখায় যে, ক্লাসরুমের পাঠদানের মান সন্তোষজনক নয়। শিক্ষকদের যোগ্যতার দিক থেকে, আমরা প্রায়শই দেখি মাত্র ৬০ শতাংশের মতো শিক্ষক পর্যাপ্তভাবে যোগ্য।'
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এই ফলাফল আমাদের আত্মোপলব্ধি করতে বাধ্য করবে।
তিনি বলেন, 'শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শেখার প্রক্রিয়া ফলাফলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। করোনার পর শিক্ষার মান দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পেয়েছে।' তিনি আরও যোগ করেন, শহরের তুলনায় গ্রামীণ শিক্ষার বৈষম্যও এই ফলাফলে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এবারের পাসের হার হ্রাসের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে আলোচনা করা হচ্ছে পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং খাতা মূল্যায়নের কঠোরতা। সংশ্লিষ্ট অনেকের ধারণা, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার অনিয়ম রোধে কঠোরতা এবং খাতা মূল্যায়নে নমনীয়তা না দেখানোই পাসের হার কমার অন্যতম কারণ।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আকতারুজ্জামান বলেন, এবার অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, 'যারা পড়াশোনা করেছে, তারা কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রীর বিশেষ তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা একটি সুশৃঙ্খল ও সঠিক পরীক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের ফলাফল পেয়েছে।'
উল্লেখ্য, চলতি বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১৮,২৯,৪৮৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে পাস করেছে ১১,৩৮,৮৭৭ জন।
দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার তাগিদ
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মনজুর আহমদ বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশে এই ধরনের গবেষণা ধারাবাহিকভাবে করা হয় না।
তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গবেষণা খুবই জরুরি, কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণা নিয়মিত করা হয় না। পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, মনিটরিং এবং শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগের বৈষম্য পর্যালোচনা না করে কেবল পাসের হার কমার ওপর আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত নয়।'
মনজুর আহমদ বলেন, শিক্ষাদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর নিয়মিত গবেষণা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে এবং নীতিনির্ধারকদের উপযুক্ত সমাধান নিয়ে কাজ করতে সহায়তা করবে।
ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুলের শিক্ষক উর্মি রহমান এমা শিক্ষা ব্যবস্থার স্থায়িত্ব বা স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, 'যখনই ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়, তখনই শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবার জন্য তার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি স্থায়িত্ব প্রয়োজন।'
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা এখন আবারও সনাতন পদ্ধতিতে ফিরে যাচ্ছে, যেখানে পাঠ্যপুস্তক-ভিত্তিক পড়াশোনা এবং নিয়মিত ক্লাসরুমের শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও যোগ করেন, 'শিক্ষার্থীরা এখন নিয়মিত পড়াশোনায় যুক্ত হবে। তাদের এখন সম্পূর্ণরূপে ক্লাসরুমমুখী হতে হবে।'
