অনুমতি ছাড়া তেল অনুসন্ধান নয়, ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ মার্কিন কোম্পানিকে গ্রিনল্যান্ডের 'কড়া সতর্কবার্তা'
অনুমতি ছাড়াই গ্রিনল্যান্ডে তেল অনুসন্ধানের সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ায় মার্কিন একটি তেল কোম্পানিকে 'কড়া সতর্কবার্তা' দিয়েছে গ্রিনল্যান্ড সরকার। কোম্পানিটির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড সরকার জানিয়েছে, গত মাসে দ্বীপটির পূর্ব উপকূলে তেল অনুসন্ধানের জন্য ব্যবহৃত খননযন্ত্র নিয়ে আসা হয়েছে। এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে দেশটির শিল্প ও খনিজ বিভাগ জানায়, 'পরিকল্পিত তেল অনুসন্ধান খননকাজের' সঙ্গে এসব যন্ত্রপাতি আনা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জি নামের টেক্সাসভিত্তিক একটি কোম্পানি এই তেল অনুসন্ধান প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। প্রতিষ্ঠানটি গত বছর গঠিত হয় এবং এর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্পর্ক রয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও অন্যতম বড় শেয়ারহোল্ডার ল্যারি সুয়েটস ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে প্রবেশাধিকার পান বলে ধারণা করা হয়। চলতি বছরের শুরুর দিকে তার স্ত্রী ট্রাম্পের মার-আ-লাগো রিসোর্ট থেকে ছবি পোস্ট করেছিলেন।
কোম্পানিটি দাবি করেছে, গ্রিনল্যান্ডের জেমসন ল্যান্ড অঞ্চলের মাটির নিচে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল থাকতে পারে। তেল অনুসন্ধানে অর্থায়নের বিনিময়ে নতুন একটি খনন প্রকল্পের বেশির ভাগ মালিকানাও নিয়েছে তারা। তবে প্রকল্পটি শুরু করতে এখনও গ্রিনল্যান্ড সরকারের অনুমতি প্রয়োজন।
গত মাসে স্থানীয় বাসিন্দারা তেল অনুসন্ধানের সরঞ্জাম উপকূলে নিয়ে যেতে দেখার কয়েক দিন পরই ট্রাম্প আবারও আধা-স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেন।
গত সপ্তাহের শেষে নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি ছবি পোস্ট করেন ট্রাম্প। ছবিতে তাকে গ্রিনল্যান্ডের একটি গ্রামের দিকে পাহাড়ের আড়াল থেকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। ছবির সঙ্গে তিনি লেখেন, 'হ্যালো, গ্রিনল্যান্ড!'
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ না করায় আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তিনি বলেছিলেন, 'জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে' যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক রাজ্যের অংশ। ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই ন্যাটোর সদস্য। ফলে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিলে ন্যাটো সদস্যদের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যত ভেঙে পড়তে পারে। ডেনমার্ক ট্রাম্পের এমন হুমকিকে 'অগ্রহণযোগ্য' বলে নিন্দা জানিয়েছে।
ট্রাম্প পরে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার বক্তব্যের সুর কিছুটা নরম করলেও ৮ লাখ ৩৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের এই দ্বীপকে তিনি 'গুরুত্বপূর্ণ' বলে উল্লেখ করেছেন। তার পরিকল্পিত 'গোল্ডেন ডোম' ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির জন্য গ্রিনল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সুরক্ষিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসরায়েলের 'আয়রন ডোম'-এর আদলে তৈরি হতে যাওয়া 'গোল্ডেন ডোমে' যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষায় স্যাটেলাইট, সেন্সর ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার অস্ত্রের একটি নেটওয়ার্ক থাকবে।
গত মাসে গ্রিনল্যান্ড এনার্জি তাদের পরিচালনা পর্ষদে ক্যারল ক্রেইগকে নিয়োগ দিয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ক্রেইগ ট্রাম্পের 'গোল্ডেন ডোম' প্রকল্পে কাজ করছেন।
এ ছাড়া কোম্পানিটি 'ড. ফিল' নামে পরিচিত সাবেক মার্কিন টকশো উপস্থাপক ফিলিপ ম্যাকগ্রকে তাদের 'আর্কটিক অভিযান' নিয়ে নির্মিতব্য একটি নতুন তথ্যচিত্র সিরিজের উপস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ট্রাম্প তাকে 'ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন'-এ নিয়োগ দেন।
তবে তেল অনুসন্ধান প্রকল্পের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের দখলে নেওয়ার পরিকল্পনার সম্পর্ক থাকার দাবি অস্বীকার করেছে গ্রিনল্যান্ড এনার্জি।
কোম্পানির চেয়ারম্যান ল্যারি সুয়েটস গত জুনে জানান, কোম্পানির এক প্রতিনিধি গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তেল অনুসন্ধানের সরঞ্জাম আনার সরকারি অনুমতি কোম্পানিটির ইতোমধ্যে রয়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, 'এই প্রকল্প নিয়ে আমাদের অতিরিক্ত উৎসাহের কারণে আমরা এমনভাবে বিষয়টি জানিয়েছিলাম, যা বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।'
বৃহস্পতিবার শেয়ারহোল্ডারদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে গ্রিনল্যান্ড এনার্জি জানায়, 'প্রকল্পের নেতৃত্ব ও গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রক ও তদারককারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো গঠনমূলক হয়েছে। খননকাজের জন্য প্রয়োজনীয় বাকি অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হচ্ছে, তাতে আমরা উৎসাহিত।'
