ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ভেস্তে দিতেই ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার ভুয়া তথ্য দিয়েছিল ইসরায়েল, সন্দেহ তুরস্কের
গত মাসে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য ইরানের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ইসরায়েল যে গোয়েন্দা প্রতিবেদন দিয়েছিল, তা আসলে একটি সাজানো কৌশল হতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তুরস্কের কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আলোচনা ভেস্তে দিতেই এমন তথ্য দেওয়া হয়েছিল। মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে এমন তথ্যই তুলে ধরা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে ট্রাম্পকে গোপনে দেশটি থেকে সরিয়ে নেয় হোয়াইট হাউস। ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্প ও এয়ার ফোর্স ওয়ানকে লক্ষ্য করে নিরাপত্তা হুমকি থাকায় তাকে খাবার পরিবহনের কার্টে করে একটি সামরিক বিমানে নেওয়া হয় বলে একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা সোমবার জানিয়েছেন।
৮ জুলাই দুপুর ২টার দিকে আঙ্কারা বিমানবন্দরে তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের বিষয়টি সাংবাদিকদের নজরে আসে। ওই বিমানবন্দরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এয়ার ফোর্স ওয়ান রাখা ছিল।
৭ ও ৮ জুলাই ন্যাটো সম্মেলনকে ঘিরে আঙ্কারায় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফুটপাতে চলাচলও সীমিত করা হয়। সরকারি কর্মীদের এক সপ্তাহের প্রশাসনিক ছুটি দেওয়া হয়েছিল। ফলে সম্মেলন চলাকালে আঙ্কারার অধিকাংশ এলাকা ছিল প্রায় জনশূন্য।
সম্মেলন উপলক্ষে তুরস্ক সরকার দেশটির বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটিকেও বিশেষভাবে প্রস্তুত করেছিল। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে আঙ্কারা বিমানবন্দর নামে পরিচিত। সেখান থেকে সম্মেলনস্থলে যেতে সময় লাগত মাত্র ১০ মিনিট।
এমন কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই মার্কিন কর্মকর্তারা তুরস্কের কর্মকর্তাদের জানান, ইসরায়েল থেকে তারা একটি গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছেন। ওই তথ্যে বলা হয়েছিল, ইরান ট্রাম্পকে 'টার্গেট' করতে পারে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা মিডল ইস্ট আইকে জানান, ইরানের একটি গোপন অপারেশন ইউনিট আঙ্কারা বিমানবন্দরের কাছে ট্রাম্পের নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন মিডল ইস্ট আইকে বলেন, 'ধারণা করা হচ্ছিল, ইরানিরা আঙ্কারা বিমানবন্দরের এক কিলোমিটারের মধ্যে থেকে ম্যানপ্যাডস নামে পরিচিত কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বিমানটিতে হামলা চালাতে পারে।'
তুরস্কের রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এসেনবোগা বিমানবন্দরের তুলনায় আঙ্কারা বিমানবন্দরের আশপাশে অনেক বেশি বেসামরিক স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি রানওয়ে থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে। এসব কারণে তুর্কি কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সতর্কতা নিতে বাধ্য হন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানান, মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসও আরও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে চেয়েছিল। প্রথমে ট্রাম্পের আঙ্কারা বিমানবন্দর থেকে যাত্রা করার পরিকল্পনা বদলে এসেনবোগা বিমানবন্দর করা হয়। সেখানে বিমানবন্দরের সীমানা থেকে বেসামরিক স্থাপনা তুলনামূলকভাবে দূরে। এরপর পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান ফিরিয়ে আনা হয়। কারণ, এতে এমন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল যা নতুন বিমানে ছিল না।
ট্রাম্পকে হত্যার জন্য ইরানের সম্ভাব্য হামলার হুমকিটিকে অনেক মার্কিন কর্মকর্তা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেছিলেন। এর আগে ইরান দুইবার এমন হামলার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তানি নাগরিক আসিফ মার্চেন্টকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে মার্কিন রাজনীতিবিদের (যার মধ্যে ট্রাম্পও থাকতে পারেন) হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বরে মার্কিন বিচার বিভাগ আফগান নাগরিক ফারহাদ শাকারির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ইরান সরকার তাকে ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করতে নির্দেশ দিয়েছিল। তবে ইরান ট্রাম্প বা অন্য কোনো মার্কিন কর্মকর্তাকে হত্যার 'টার্গেট' করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সিক্রেট সার্ভিস সর্বশেষ গোয়েন্দা তথ্যটিকে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছিল যে, পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার পর ট্রাম্পকে গোপনে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে আরও বলা হয়, তাকে একটি ক্যাটারিং গাড়িতে করে মার্কিন সরকারের আরেকটি বিমান সি-৩২-এ তোলা হয়।
তুরস্কের একজন কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মার্কিন কর্মকর্তারা সি-৩২ বিমানটির জন্য অতিরিক্ত অবতরণের অনুমতি চেয়েছিলেন। শেষ মুহূর্তে তারা পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে চাপ দেন। এতে আঙ্কারার কর্মকর্তাদের মনে হয়, কোনো একটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে।
তবে ইসরায়েলের এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে আসে, যখন ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির চেষ্টা করছিলেন। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বারবার বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়েছে। তিনি আলোচনার অগ্রগতি নিয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেন। বৈঠকে উপস্থিত এক ব্যক্তি মিডল ইস্ট আইকে এ কথা জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের এই অবস্থান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থানের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। নেতানিয়াহু যুদ্ধ আবার শুরু করার পক্ষে ছিলেন। তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় আরও বড় হামলা এবং ইরানের নেতাদের হত্যা করতে নতুন করে অভিযান চালানোর জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।
'এই প্রতিবেদন সঠিক হওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না'
তুরস্কের কর্মকর্তারা এখন বলছেন, ইসরায়েলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি সম্ভবত নেতানিয়াহু সরকারের একটি সাজানো কৌশল ছিল বলেই তারা মনে করছেন। এর মাধ্যমে ইসরায়েলকে ট্রাম্পকে রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরা, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে দেওয়া এবং ট্রাম্পের সঙ্গে এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দুর্বল করাই উদ্দেশ্য ছিল।
তথাকথিত হত্যাচেষ্টার এক দিন আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি তুরস্কের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত দেন। ২০১৯ সালে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার কারণে তুরস্কের ওপর ওই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
ট্রাম্প একই সঙ্গে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির কথাও জানান। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর বিরোধিতা করছেন। তার মতে, তুরস্ককে এফ-৩৫ দিলে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে এবং ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কমে যাবে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, 'অবশ্যই আমরা প্রতিবেদনটিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলাম এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের যতটা সম্ভব সহায়তা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট ছিল, এই প্রতিবেদন সঠিক হওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।'
ইরানের গোপন দলগুলো এর আগে তুরস্কে ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের অপহরণ ও হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে তেহরান কখনো সেখানে সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্রের বাইরে কোনো জটিল অভিযান চালানোর সাহস করেনি।
এ ধরনের হামলা চালাতে তুরস্ক সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য প্রয়োজন হতো। এর পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়স্থল, আঙ্কারায় প্রবেশ ও বের হওয়ার গোপন পথ এবং সম্মেলনের আগে অসংখ্য সড়ক অবরোধ ও নিরাপত্তাচৌকি পার করে ম্যানপ্যাডস ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করতে হতো।
এ ধরনের কোনো হামলার চেষ্টা হলে ইরানের সঙ্গে তুরস্কের সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতো। যুদ্ধ শুরুর পরও তেহরান ও আঙ্কারার মধ্যে তুলনামূলক স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
ইরানের কর্মকর্তারা এর আগে কয়েকবার তুরস্ককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাদের দাবি, পশ্চিম ইরানে বিদ্রোহ উসকে দিতে মোসাদ ও সিআইএ একটি ষড়যন্ত্র করেছিল। এতে ইরানের সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল। তুরস্ক ওই ষড়যন্ত্রে সমর্থন দেয়নি।
আঙ্কারার এক কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, সম্মেলনের মাত্র এক মাস পর ট্রাম্পকে রক্ষায় সিক্রেট সার্ভিসের অভিযানের তথ্য ফাঁস হওয়াটা বেশ 'বিদ্রূপাত্মক'।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'আমার ধারণা, যে হামলাটি কখনো ঘটেনি এবং সম্ভবত কখনো যেটির পরিকল্পনাই করা হয়নি, তার জন্য তাদের নায়ক দরকার।'
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউস ও ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে মিডল ইস্ট আই।
