বাংলা কিউআর: ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের উৎসাহ দিতে ১০০ কোটি টাকার তহবিল
বাংলা কিউআর ব্যবহারে ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের উৎসাহিত করতে ১০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রয়োজন হলে এ তহবিলের আকার আরও বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
শনিবার (৮ আগস্ট) চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলের নীলগিরি হলে 'বাংলা কিউআর লেনদেন বিষয়ক কর্মশালায়' প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা আইএফসির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত 'ক্যাশলেস ডিজিটাল বাংলাদেশ' প্রকল্পের আওতায় এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
গভর্নর বলেন, 'আশপাশের দেশগুলো ডিজিটাল পেমেন্ট প্রসারে যেভাবে কাজ করেছে, বাংলাদেশও সেসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশ কিছুটা দেরিতে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার এ পর্যায়ে এসেছে। তবে এর সুবিধা হলো, অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের জন্য কার্যকর নীতি ও ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।'
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, 'বর্তমানে বাংলাদেশে মাসে প্রায় এক কোটি ডিজিটাল লেনদেন হচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরের শেষে প্রতিদিন এক কোটি ডিজিটাল লেনদেন করার লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।'
তিনি বলেন, 'বর্তমানে মাসে যে পরিমাণ ডিজিটাল লেনদেন হচ্ছে, সেটিকে প্রতিদিন এক কোটিতে নিয়ে যেতে হলে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৩০ গুণ বাড়াতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সময় রয়েছে প্রায় ১০ মাস।'
গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল লেনদেনের সম্প্রসারণে অন্যতম বড় বাধা হচ্ছে স্মার্টফোনের সীমিত ব্যবহার। দেশে এখনো প্রায় ছয় কোটি মানুষ বাটন ফোন ব্যবহার করেন। তাদের ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনতে স্বল্পমূল্যে অ্যান্ড্রয়েড ফোন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'বাটন ফোন ব্যবহারকারীরা ভালো একটি ফোনের জন্য প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে আগ্রহী। অন্যদিকে নির্মাতারা জানিয়েছেন, ৮ হাজার টাকার নিচে অ্যান্ড্রয়েড ফোন দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে প্রায় ৫ হাজার টাকার যে ব্যবধান রয়েছে, তা পূরণ করতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।'
এই বিনিয়োগের ব্যবস্থা কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, 'মোবাইল ফোন কিস্তিতে কেনার সুযোগ তৈরির বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে কিস্তিতে অ্যান্ড্রয়েড ফোন দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা গেলে বিপুলসংখ্যক বাটন ফোন ব্যবহারকারীকে ডিজিটাল ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা সম্ভব হবে।'
ছয় মাসে বাংলা কিউআর লেনদেন ৮.৬ গুণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলা কিউআর ব্যবহারে দ্রুত গতি এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ৭ লাখ ২৩ হাজার ৩৭৮টি লেনদেন হয়েছিল। এসব লেনদেনের মোট মূল্য ছিল ২১২ কোটি ৫ লাখ টাকা।
জুলাইয়ে এসে লেনদেনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ লাখ ৫৪ হাজার ৯৩৮টিতে। একই সময়ে লেনদেনের মোট মূল্য বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪৭৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ৮.৬ গুণ এবং লেনদেনের মোট মূল্য প্রায় ৭ গুণ বেড়েছে।
তিন মাসে মার্চেন্ট বেড়েছে ৭৯ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলা কিউআর ব্যবহারে মার্চেন্টের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দেশে বাংলা কিউআর মার্চেন্টের সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৭১২। জুনে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ১৮৮। আর জুলাইয়ে মার্চেন্টের সংখ্যা আরও বেড়ে ২৪ লাখ ২৫ হাজার ১৩৩-এ পৌঁছেছে।
অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে মার্চেন্টের সংখ্যা প্রায় ৭৯ শতাংশ বেড়েছে। আর গত ১০ মাসে মার্চেন্টের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯৩ শতাংশ।
নগদ ব্যবস্থাপনায় বছরে ব্যয় ২০ হাজার কোটি টাকা
কর্মশালায় প্রশিক্ষক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগ-১-এর অতিরিক্ত পরিচালক মো. পারওয়েজ আনজাম মুনির বলেন, 'দেশে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।' টাকা ছাপানো থেকে শুরু করে সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে উৎপাদন, মানুষের হাতে পৌঁছানো, ব্যবহার, নোট নষ্ট ও ছেঁড়াফাটা হওয়ার পর তা সংগ্রহ এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় এ বিপুল অর্থ ব্যয় হয় বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, 'আমরা টাকা ছাপাই, সেটি মানুষের কাছে যায়, মানুষ ব্যবহার করে, নোট নোংরা ও ছেঁড়াফাটা হয়ে যায়। এরপর সেটি আবার সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। আমরা তো গরিব দেশ। শুধু নগদ নোটের পেছনে এত টাকা ব্যয় করা আসলে চরম বিলাসিতা ও অপচয়।'
তার মতে, নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার ঘটানো গেলে এ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। ডিজিটাল লেনদেনে খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
চাঁদাবাজি ও কর্মচারীর মাধ্যমে অর্থ লেনদেনেও কমবে ঝুঁকি
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, 'ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে ব্যবসায়ীদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেক সময় কর্মচারীদের মাধ্যমে ব্যবসার লেনদেন পরিচালনা করতে হয়। এতে কোনো অর্থ হারিয়ে যাচ্ছে কি না বা লেনদেনে অনিয়ম হচ্ছে কি না—এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশঙ্কা থাকে।'
ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও নগদের বিকল্প হিসেবে ডিজিটাল লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলা কিউআরকে সর্বজনীন করার উদ্যোগ
বাংলা কিউআর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করতে দেশের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় মার্চেন্ট লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কিউআর কোড বাংলা কিউআর দিয়ে প্রতিস্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্চেন্টের হিসাবে অর্থ জমা হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ বলেন, 'একটি আর্থিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিমূলক পেমেন্ট সিস্টেম প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।'
তিনি বলেন, 'বর্তমানে দেশে প্রায় ২৪ লাখ মার্চেন্ট বাংলা কিউআর ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ লেনদেন হচ্ছে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো হলে ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত বাড়াতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।'
ডিজিটাল লেনদেনে প্রতারণার ঝুঁকিও রয়েছে
কর্মশালায় ডিজিটাল লেনদেনের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কেও মার্চেন্টদের সচেতন করা হয়। প্রতারণামূলক কল ও এসএমএসের মাধ্যমে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা সরকারি সংস্থার পরিচয় দিয়ে ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।
এ ছাড়া দুর্বল পাসওয়ার্ড, হ্যাকিং, ভুল নম্বরে অর্থ পাঠানো, ভুয়া কাস্টমার কেয়ার, রোমান্স স্ক্যাম, ফিশিং, ম্যালওয়্যার ও ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রতারণার ঝুঁকি রয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় ব্যক্তিগত তথ্য, পিন বা ওটিপি কারও সঙ্গে শেয়ার না করা এবং অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রধান কার্যালয়ের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ এবং আইএফসির প্রতিনিধি হাসান শাহরিয়ার।
কর্মশালায় অন্তত ২০ জন নারী মার্চেন্টসহ প্রায় ১২০ জন বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী মার্চেন্ট অংশ নেন। মার্চেন্টদের সচেতন করতে পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগ-১-এর অতিরিক্ত পরিচালক মো. পারওয়েজ আনজাম মুনির, যুগ্মপরিচালক জুয়েল মজুমদার এবং মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন তিনটি সেশন পরিচালনা করেন।
সেশনগুলোতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার পদ্ধতি, সুবিধা, প্রয়োজনীয়তা ও নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন নিয়ে আলোচনা করা হয়। পরে গভর্নর বাংলা কিউআর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট সিস্টেম চালু, চার্জ কমানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে মার্চেন্টদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন।
আইএফসির প্রতিনিধি হাসান শাহরিয়ার জানান, তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল মাসে ২০ লাখ ডিজিটাল লেনদেন। বর্তমানে মাসে প্রায় এক কোটি লেনদেন হচ্ছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের অগ্রযাত্রায় তাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, 'ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী ও সর্বজনীন করার ক্ষেত্রে এ কর্মশালা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।'
কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালক মো. হানিফ মিয়াসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
