গদিঘর: রায়েরবাজারের পালপাড়ার শেষ ঐতিহ্য
গদিঘরটি ছিল পালপাড়ার প্রাণকেন্দ্র। পালদের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিচার-শালিশ, বিয়েশাদি—সবকিছুতেই গদিঘর ভূমিকা রাখত। রায়েরবাজার পাল সমিতি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৬ সালে। নিবন্ধন পায় অবশ্য অনেক পরে ১৯১৮ সালে। ট্রাস্টের অফিস হিসেবে গদিঘরটিও প্রতিষ্ঠিত হয় ওই একই বছর।
গদিঘরের রায়েরবাজার খাল
রায়েরবাজারে তেরো ঘর পালের আগমন ঘটে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ভারতের রাজমহল থেকে। জায়গাটি পালেরা পছন্দ করেছিলেন তাদের পেশাগত কারণেই। মাটির হাঁড়ি বানাতে যে লাল দোআঁশ মাটি লাগত, তা পাওয়া যেত রায়েরবাজারে।
ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস ওয়াইজকে (১৮৩৫-১৮৮৬) ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন বাংলাদেশের নৃতত্ত্ব চর্চার পথিকৃৎ বলে উল্লেখ করেছেন। ওয়াইজের বহুল আলোচিত গ্রন্থ 'নোটস অন রেসেস, কাস্টস অ্যান্ড ট্রেডস অব ইস্টার্ন বেঙ্গল'।
রায়েরবাজার সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, 'বুড়িগঙ্গাতীরের এলাকাটিতে কেবল পালেরাই বসবাস করত। এটি গড়ে ওঠে মোগল আমলে। কুমাররা খুবই সংঘবদ্ধ জনগোষ্ঠি। হিসাব রাখার প্রয়োজনে তারা রায়েরবাজারে গদিঘর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।'
মানিকগঞ্জের বালিয়াটির জমিদার রায় চৌধুরীদের সম্পর্ক ছিল বলে এর নামকরণ হয় রায়েরবাজার। তবে তা ব্রিটিশ আমলের আগে হওয়ার কথা নয়, কারণ বালিয়াটির জমিদারদের প্রসার ঘটেছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর। আর ততদিনে পালদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। আদি তেরো ঘর টিকে থাকল তেরো ঘর পাড়া নামের মধ্যে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পালেরা নিমতলী পাড়া, পুলপাড়া, তেরো ঘর পাড়া, মধ্যপাড়াসহ ছয়টি ছোট ছোট পাড়ায় বিভক্ত হয়ে গেল। সবগুলো পাড়ার যোগসূত্র হয়ে থাকল ওই গদিঘর।
রায়েরবাজারের পাল বা কুম্ভকার বা কুমোরেরা সারা বাংলাদেশে সুনাম অর্জন করেছিল ভাতের ও সালুনের (তরকারি) পাতিল তৈরিতে। এদের হাঁড়ি গড়ার নিজস্ব ঘরানা তৈরি হয়েছিল, যা অন্য পালেরা রপ্ত করতে করতে পারেনি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে রায়েরবাজারের হাঁড়ি যে দোকানে থাকত না সে দোকানে কাস্টমার ভিড়ত না।
হাড়িগুলো রায়েরবাজার খাল থেকে বড় বড় নৌকায় বোঝাই হয়ে বাংলাদেশের নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়ত। পাঁচ মাইল দীর্ঘ রায়েরবাজার খালটি খনন করা হয়েছিল গদিঘরের ব্যবস্থাপনায়। বুড়িগঙ্গাকে এই খাল তুরাগের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল।
সদানন্দের 'একা কুম্ভ'
'একা কুম্ভ' নামের বইয়ের লেখক সদানন্দ পাল, লিখেছেন, 'এখানে প্রতিদিন লাখখানেক হাঁড়ি তৈরি হতো। এদের পাল সমিতি গদি নামে নিজস্ব গদি ছিল। এই গদি মারফত সব মৃৎপাত্র বিক্রি হতো। কাউকে কোনো হাটে যেতে হতো না। নৌকা করে বড় বড় পাইকার গদির সহায়তায় মাল কিনত। গদির নিজস্ব দালাল ছিল। কোন কারখানা বা বাড়িতে কী মাল আছে, তার খবর রাখত দালালেরা। দালাল পাইকারের সঙ্গে সবরকম সহযোগিতা করত। পাইকার যত টাকার মাল কিনত - কারখানা মালিক তা স্লিপ করে দিত। সেই স্লিপ দেখে গদি টাকায় দু পয়সা দালালি নিত। দালালেরা গদি থেকে মাসিক ভাতা পেত। দালালের সন্তানরাই দালাল হতো পরবর্তীতে।'
সদানন্দ পালের বইটির পুরো নাম, 'একা কুম্ভ - এক উদ্বাস্তু কুম্ভকারের মাটিমাখা আত্মকথা'। রায়েরবাজারের এক পাল পরিবারে তার জন্ম। পালবাড়ির আর আট-দশটি ছেলে-মেয়ের মতো তার পড়াশোনাও বেশি দূর এগোয়নি, সপ্তম শ্রেণিতে গিয়েই শেষ।
তবে সাহিত্য রচনায় তার আগ্রহ ছিল অন্য সব কিছুর চেয়ে বেশি। ছড়া, কবিতা, নাটক, গল্প ইত্যাদি লিখেছেন নিয়মিত। যুগান্তর, গণশক্তি, সংবাদ প্রতিদিনে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৬৪ সালে পরিবারের সঙ্গে তিনিও পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমান। বাস্তুহারা হওয়ার কষ্ট আর ভিনদেশে ঠাঁই গাড়ার সংগ্রাম নিয়ে রচনা করেছেন একা কুম্ভ।
গদির নিজস্ব চেকপোস্ট ছিল
একা কুম্ভ বইটির প্রথম অধ্যায়ের নাম জন্মভিটে। এতে তিনি গদি নিয়ে আরো লিখছেন, 'গ্রামে হাঁড়ি কিনে গদির চালান না নিয়ে কেউ গ্রাম থেকে বেরোতে পারত না। নিজস্ব চেক পোস্ট ছিল। গদির পরিচালক মণ্ডলি পালেরাই হতো। প্রতি পাঁচ বছর পর নির্বাচন হতো। যারা নির্বাচিত হতো- তারা সমাজের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকত। মেম্বার সম্মানে ভূষিত হতো। গ্রাম থেকে কোর্টে মামলা যেত না বলা চলে। এই গদির আয় থেকে একটি মন্দির, একটি মসজিদ ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলত। গদি সেই স্কুলকে উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিণত করে।'
সদানন্দ পালের বই থেকে আরো জানা গেল, মন্দির ও মসজিদে পাইকারদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল গদিঘর। গদিঘরের নিজস্ব ডেকরেটর ছিল। গ্রামে পালেদের অনুষ্ঠানাদিতে বিনা ভাড়ায় তা বিলি করা হতো। দেশ ভাগের আগে পালদের ভোটার সংখ্যা ছিল আট হাজার। বিয়ে হতো এই গ্রামেরই ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে।
সমিতির সভাপতি
বর্ষার আকাশ খুবই অস্থির। যখন-তখন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। পনের জুলাই যখন ঘর থেকে বের হয়েছিলাম আকাশ পরিস্কার ছিল, রায়েরবাজার হাই স্কুলের কাছে যেতেই হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি এলো।
বৃষ্টি একটু থামলে গদিঘর এলাকায় পৌঁছালাম। আখড়া মন্দিরের কাছে একটি স্টেশনারি দোকান পেলাম। যে ভদ্রলোক বসেছিলেন তাকে বললাম, 'এমন কি কেউ বেঁচে আছেন যিনি ষাটের দশকের সাক্ষী।'
তিনি বিশ্বনাথ পালের কথা মনে করলেন। ২০০১ সাল থেকে তিনি পালপাড়া সমিতি ট্রাস্টের সভাপতি এবং ১৯৭৭ সাল থেকে আখড়া মন্দিরেরও সভাপতি।
মন্দিরের ভিতরেই ছিলেন বিশ্বনাথ পাল। পরের দিন রথযাত্রা বলে তার আয়োজন করছিলেন। এখন একাশি বছর বয়স তার। এই বয়সেও বেশ শক্তপোক্ত। কানে ঠিক শোনেন, চোখেও কম দেখেন না, হাঁটতে ভর দিতে হয় না লাঠিতে।
গুপ্তি মন্ত্র জানতে চাইলে বললেন, "আরে বাপু আমরা হলাম পালের পো। নড়াচড়া শিখেছি তো বাবা মাটি-ছানার কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করেছি। আরামের জীবন আমাদের ছিল না আর সয়ও না। এটাই ধরে নাও গুপ্তি মন্ত্র।"
কুমোর বাড়ি বড় হয়
বিশ্বনাথেরা ৫ ভাই, ৩ বোন। পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য ভারতে চলে গেছে, তিনিও গিয়েছিলেন, কিন্তু ভালো লাগেনি বলে ফিরে এসেছেন। সমাজকর্মই এখন তার প্রধান কাজ। বিশ্বনাথ বললেন, "পালদের বাড়িগুলো দুই-আড়াই বিঘার কম হতো না। মাটি নিয়েই কাজ তাই মাটির দরকার বেশি। বাড়িতে সাজনা, কাঁঠাল, পেঁপে , কলা, আমের গাছ থাকত। বাঁধানো মঞ্চের ওপর তুলসী গাছ ছিল সব বাড়িতেই। আর খাওয়ার পানির জন্য কুয়াও থাকত। প্রতি বাড়িতে গোয়ালঘর থাকত। দুধ ও দই থাকত পালেদের নিত্যদিনের খাবার তালিকায়।"
আটান্ন সালে বিশ্বনাথ কিশোরবেলা পার করেছিলেন। তারা ছিলেন মধ্য পাড়ার বাসিন্দা। তাদের বাড়িতে পাঁচটি ঘর ছিল, যার একটি পুইন ঘর। যে ঘরে হাঁড়ি পোড়ানো হয় সেটিই পুইন ঘর। সেখানে চুল্লি বা ভাটি থাকে। মাটির বেড়ার ঘরগুলোর ওপরে ছিল টিনের চাল। কেবল পুইন ঘরে ছিল টালির ছাদ। বিশ্বনাথদের ঘরে কোনো খাট বা চৌকি ছিল না। ঢালা বিছানায় তারা ঘুমাতেন।
যেমন যেত কুমোরের দিন
কুমোরদের প্রতিটি বাড়িই ছিল কারখানা। ফজরের আজানের সময় ঘুম থেকে জেগে কাজে লেগে যেতেন। ছোটদের বেশি করতে হতো মাটি ছানার কাজ। চাকে হাড়ির কান্দা বা মুখ তৈরি করতেন মূলত বয়স্ক পুরুষরা, হাঁড়ি পোড়ানোর দায়িত্বও তারা পালন করতেন।
পালদের মেয়েরা হাড়ির তলা তৈরি ও লেপার কাজ করতেন। পালেরা তিনবেলাই ভাত খেতেন। সকালের খাবারে থাকত ফ্যানাভাত ও আলুসেদ্ধ, দুপুরের খাবারে সবজি, টক ডাল থাকত। খাওয়ার পর এক ঘণ্টা বিশ্রাম পাওয়া যেত। তারপর আবার কাজ।
চেষ্টা থাকত সন্ধ্যার আগে কাজ শেষ করে ফেলার। তবে যদি টার্গেট পূরণ না হতো তবে কুপি জ্বালিয়ে রাতেও কাজ করতে হতো বলে জানালেন বিশ্বনাথ পাল।
সদানন্দ পাল লিখেছেন, 'আমাদের সম্প্রদায়ের নিয়ম ছিল সপ্তাহের শনিবার হাটবার। সেদিন সব বাড়ি চাক বন্ধ থাকত। কাজের চাহিদা বুঝে কারখানা মালিক ঠিক করে দিতেন কোন ব্যক্তি কত সংখ্যা উৎপাদন করবেন। বিকাল পাঁচটা-ছটার মধ্যে প্রায় প্রত্যেকেরই সে উৎপাদন হয়ে যেত। যার হাত চালু, তার কাজ বেলা ৩-৪টার মধ্যেই শেষ হতো। তারপর রাত নয়টা পর্যন্ত হরিকীর্তন, পুঁথিপাঠ, যাত্রার রিহার্সাল চলত।'
বিশ্বনাথ পাল বলছিলেন, 'পালদের ছেলেরা ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে বিয়ে করে ফেলত। বিয়ে মানে বাড়িতে আরেকজন কাজের লোক, তাই তাড়াতাড়ি বিয়ে হওয়ার চল চালু হয়ে গিয়েছিল। বিয়ে উপলক্ষে গদিঘরে পাত্রপক্ষ ২ টাকা আর পাত্রীপক্ষ ১ টাকা মাইন্যের চাঁদা দিত। এই টাকা বিপদ-আপদের প্রয়োজনে গদিঘরে জমা থাকত।'
বিশ্বনাথদের বাড়িতে তিনটি চাক ছিল। দুই দিনে চার বোঝা বা ৪০০ হাঁড়ি তারা তৈরি করতেন। কারখানায় ঠিকা কারিগর বা চুক্তিভিত্তিক কারিগরও ছিল। যাদের নিজেদের চাক বা পুইন ছিল না তারাই অন্যের কারখানায় কারিগর হিসেবে কাজ করতেন।
কুমোরদের সহযোগী কিছু পেশাজীবী সম্পর্কে বিশ্বনাথ পাল বললেন, 'প্রথমে বলা দরকার গাড়োয়ানদের কথা যারা গরুর গাড়ি চালাত। তারা মাটি কেটে গাড়ি বোঝাই করে কারখানায় নিয়ে আসত। দুই টাকা ছিল এক গাড়ি মাটির দাম। তারপর ছিল খ্যাড়ওয়ালা যারা শুকনো কচুরিপানা, ধানের খ্যাড় ইত্যাদি জোগান দিত। জ্বালানি হিসেবে লাকড়ি সরবরাহ করত লাকড়িওয়ালা, তখন এক মণ লাকড়ির দাম ছিল দেড় টাকা। হাঁড়ি বেশি নিতে আসত বাজিতপুরের গাওয়াল নৌকা। কারখানা থেকে হাঁড়ি নৌকায় তোলার কুলি ছিল। নৌকায় হাঁড়ি ভরার জন্য ভরনি নামে আরেকটি দল ছিল। আর ছিল সাজানি যারা হাঁড়ি সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখত।'
সেকালের রায়েরবাজার
ছয়টি পুকুর ছিল রায়েরবাজারে। সন্ধ্যার আগে যাদের কাজ ফুরাত তারা পুকুরে সাফ-সুতরো হয়ে মুদি ঘরের দাওয়া বসে তামুক টানতেন। গদিঘরেও টানা রোয়াক ছিল। অনেকে সেখানেও আড্ডা দিতেন। চায়ের দোকান ছিল মোটে ৩-৪টি। তবে মিষ্টির দোকান ৮-১০টি ছিল। গদিঘরের বেতনভোগী একাধিক সরকার (হিসাবরক্ষক) ছিলেন, নেপালি দারোয়ান ছিলেন, ঝাড়-পোছের জন্য বিহারি মেড়ো বা মাউরাও ছিলেন।
পালদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগান দিতে বাজারে কয়েকটি মুদির দোকান ছিল। তার মধ্যে বিনোদ পালের দোকানটি বেশ বড় বলে উল্লেখ করেছেন সদানন্দ পাল। সে দোকানে গোখাদ্য, মানুষের খাদ্য, দশকর্ম, শাড়ি, ধুতি, ছাতা, খড়ম সবই পাওয়া যেত। তিন বিঘা জমির ওপর ছিল বিনোদ পালের বাড়ি।
এছাড়া পান্নালাল পালের কথা লিখেছেন সদানন্দ পাল, যিনি মাটির কাজ ছাড়াও সাইকেল, ডেলাইট, হ্যাজাক, গ্রামোফোন সারাই করতে জানতেন।
সদানন্দ পাল জন্মেছিলেন ১৯৩৯ সালে। তার বই একা কুম্ভের প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছে এভাবে- 'তখনও ঢাকা কলেজ, নিউমার্কেট গড়ে ওঠেনি ঢাকায়। তবে মিরপুরে গরুর হাট ছিল। তেজগাঁওয়ে এয়ারপোর্ট ছিল। আর ছিল সদরঘাটের বিখ্যাত কামান। ছিল রমনার মাঠ। আমাদের গ্রাম রায়ের বাজারের পূর্বে ছিল ধানমন্ডির সবুজ ধানক্ষেত।'
একা কুম্ভ বইয়ে রাধামণি নামে আরেকটি অধ্যায় আছে, যা ১৯৬০ সালের কথা বলে। সদানন্দ পাল লিখেছেন, '১৯৬০ সন। একদিকে পূর্ববঙ্গ জুড়ে ভাষা আন্দোলন। অন্যদিকে অবাঙালি এসে ভরে যাচেছ ঢাকা শহরের সব প্রান্তে। .. . আমাদের গ্রামে রায়ের বাজারের শরীর ছুঁয়ে একটি অবাঙালি কলোনী গড়ে উঠল। তখন থেকে পালেদের দেশ ছাড়ার হিড়িক।' জীবিকা, প্রেম, খেলার মাঠ ছেড়ে সদানন্দ পালও চলে গিয়েছিলেন ১৯৬৪ সালে। আর ফিরে আসেননি।
পালদের অবশেষ
সত্তর ঘর পাল অবশিষ্ট আছে এখন রায়েরবাজারে। তবে কেউ কুমোরের কাজ করেন না। ঘর-বাড়িও আগের মতো নেই। আখড়া মন্দির থেকে বের হয়ে বিশ্বনাথ পাল পুলপাড় এলাকার দিতে যেতে থাকেন। দুর্গা মন্দির গলিতে মরনচাঁদের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ান।
বলেন, "মরনচাঁদ ছিলেন আমাদের এলাকার গুণী জন। রায়েরবাজারের পালদের মধ্যে আর কেউ তার মতো বড় মানুষ হয়নি। মরনচাঁদ সাদাসিধে মানুষ ছিলেন, সদাচারী ছিলেন।"
মৃৎশিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছিলেন মরন চাঁদ। লোকায়ত টেপা পুতুলকে আধুনিক রুপ দিয়েছিলেন, যা পরে মরনচাঁদের পুতুল নামে পরিচিত হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন বাংলাদেশ সফরে এসে মরনচাঁদের তৈরি 'মা ও শিশু' শিরোনামের টেপা পুতুল দেখে মুগ্ধ হন এবং হোয়াইট হাউজে নিয়ে যান।
ফোকলোর গবেষক হেনরি গ্লাসি তার 'আর্ট অ্যান্ড লাইফ অব বাংলাদেশ' গ্রন্থে মরনচাঁদের শিল্পকর্ম গুরুত্বের সঙ্গে স্থান দিয়েছেন। তিনি চারুকলা ইনস্টিটিউটে মৃৎশিল্প বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন এবং পরে প্রায় চার দশক সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। ২০১৩ সালে মরনচাঁদ মৃত্যুবরণ করেন।
সত্তর ঘর পাল থাকলেও রায়েরবাজারে এখন আর কোনো চাক নেই, পুইন নেই। শেষ কুমোর গুণমনি পালের চাক থেমে গিয়েছে দেড় যুগ আগে। থাকার মধ্যে কেবল গদিঘরটি আছে, পলেস্তরা খসে গিয়ে যার ইটগুলো দাঁত বের করে হাসছে। পালসমিতির সভাপতি হিসেবে বিশ্বজিৎ পাল গদিঘরটি দখলমুক্ত করতে মোকদ্দমা লড়ছেন।
ছবি: মেহেদি হাসান