দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা, রূপসা বিদ্যুৎ প্রকল্পে আরও এক বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব
দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তার মধ্যে ৮০০ মেগাওয়াটের রূপসা কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৭৩৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং কমিশনিং শুরু হতে যাচ্ছে। তবে নিয়মিত বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যদিও পেট্রোবাংলা কমিশনিংয়ের জন্য সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে পাইপলাইনের মাধ্যমে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি হাইস্পিড ডিজেল (এইচএসডি) দিয়ে চালাতে হতে পারে। বিকল্প হিসেবে রেশনিং ব্যবস্থায় অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাসও সরবরাহ করা হতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এনডব্লিউপিজিসিএল) কর্মকর্তারা জানান, ভোলা থেকে খুলনায় গ্যাস সরবরাহ অথবা কুয়াকাটায় প্রস্তাবিত ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) থেকে গ্যাস সরবরাহের বিষয়েও বিবেচনা করা হচ্ছে।
নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের (নওপাজেকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাসিবুল হাসান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কমিশনিং কার্যক্রমের জন্য পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছে। তবে এই সরবরাহ কেবল পরীক্ষামূলক কমিশনিং শেষ করার জন্য; দীর্ঘমেয়াদে রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ এখনো অনিশ্চিত। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।
তিনি বলেন, বর্তমানে নওপাজেকোর প্রধান লক্ষ্য কমিশনিং কার্যক্রম শেষ করা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু রাখার জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও বিবেচনা করা হচ্ছে। গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকলে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ কমিয়ে বা রেশনিংয়ের মাধ্যমে সেখানকার গ্যাস রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
নওপাজেকো সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (এসজিসিএল) কমিশনিং কার্যক্রমের জন্য গ্যাস সরবরাহে সম্মত হয়েছে। তবে এই গ্যাস বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য নয়; শুধুমাত্র পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহার করা হবে।
সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী, ১০৭ দিনের কমিশনিং কার্যক্রমে প্রায় ১ হাজার ৯৩৩ দশমিক ৩৯ এমএমসিএফ গ্যাস প্রয়োজন হবে।
নওপাজেকোর আবেদনের জবাবে জিটিসিএল জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে সব বিদ্যুৎকেন্দ্রে একযোগে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিংয়ের জন্য গ্যাস দিতে হলে অন্য কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ কমানো বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হতে পারে।
জিটিসিএল আরও জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ বজায় রাখতে ভেড়ামারা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সিরাজগঞ্জে নওপাজেকোর একটি ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে এসজিসিএল জানিয়েছে, কমিশনিংয়ের জন্য রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। তবে নির্ধারিত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে বিপিডিবির বিদ্যমান গ্যাস বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস অথবা পেট্রোবাংলার নতুন বরাদ্দ প্রয়োজন হবে।
জ্বালানি বিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জাতীয় গ্যাস গ্রিডের একেবারে ডাউনস্ট্রিমে অবস্থান করায় রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত গ্যাসচাপ বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে কমিশনিং কার্যক্রমও গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের কমিশনিং শেষ করতে চায় নওপাজেকো।
নওপাজেকো জানিয়েছে, ৮০০ মেগাওয়াট রূপসা কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প অনুমোদনের আগেই গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পেট্রোবাংলা এক চিঠিতে জানায়, ২০২০ সালের মধ্যে প্রকল্পটিতে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন সীমিত থাকায় এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মহেশখালিতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গ্যাস সরবরাহের সবচেয়ে কার্যকর উপায় নির্ধারণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রস্তাবে পেট্রোবাংলা, জিটিসিএল, এসজিসিএল ও নওপাজেকোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশ ছিল, বিদ্যমান গ্যাস সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ব্যবহার এবং এলেঙ্গা কম্প্রেসর স্টেশন চালুর মাধ্যমে পাইপলাইনে রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মহেশখালির এলএনজি টার্মিনাল, এলেঙ্গা কম্প্রেসর স্টেশন এবং খুলনা সিটি গেট স্টেশন থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রকল্পের আওতায় পাইপলাইন নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। পরে ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ এসজিসিএলের সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।
বর্তমানে সরকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ভোলা থেকে গ্যাস আনা এবং কুয়াকাটায় নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। নওপাজেকোর আশা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রে দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে।
মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব, ব্যয় কমছে ২০%
রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কমিশনিং কার্যক্রম শেষ করতে মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০১৮ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। তবে ব্যয় না বাড়িয়েই ইতোমধ্যে তিন দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এবার মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রকল্পের মোট ব্যয় সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৯৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে ১ হাজার ৭৩৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা কমিয়ে ব্যয় ৬ হাজার ৭৬২ কোটি ২৮ লাখ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২০ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমবে।
সম্প্রতি প্রকল্পটির ব্যয় ও মেয়াদ সংশোধনের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
বাস্তবায়নকারী সংস্থা নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (নওপাজেকো) জানিয়েছে, প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৪ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৫৮ শতাংশ। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অধিকাংশ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে কমিশনিং কার্যক্রম চলছে।
তবে ইউনিট-১-এর গ্যাস টারবাইনে উচ্চ কম্পন শনাক্ত হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিয়ারিং পরিবর্তনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি। ফলে রোটর মেরামতের প্রয়োজন হয়েছে, যা শেষ করতে অতিরিক্ত সময় লাগবে।
সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী, ইউনিট-১-এর কমিশনিং ২০২৬ সালের জুন এবং ইউনিট-২-এর কমিশনিং একই বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু করতে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গ্যাস সংকটের কারণে বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে। এসব কারণ দেখিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকল্পের কয়েকটি খাতে ব্যয় বাড়লেও দরপত্রমূল্য কম হওয়ায় সামগ্রিক ব্যয় কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া এবং নির্মাণকালীন সুদ বৃদ্ধিকেও ব্যয় সংশোধনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
