ফ্রান্স দলে ‘কোনো ফরাসি খেলোয়াড় নেই’ মন্তব্যে তোপের মুখে স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ‘বর্ণবাদের’ অভিযোগ
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন ও ফ্রান্সের মহারণের আগে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। ফ্রান্স জাতীয় দল নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে বর্ণবাদের অভিযোগের মুখে পড়েছেন স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয়।
২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত স্পেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রাহয় মঙ্গলবারের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে স্পেন-ফ্রান্স ম্যাচকে সামনে রেখে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল দিবেত-এ লেখা এক কলামে মন্তব্যটি করেন। তিনি লেখেন, 'বর্তমানে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে তারা (ফ্রান্স) এক নম্বরে। তাদের দলে বিশ্বমানের খেলোয়াড়ও রয়েছে। তবে তাদের দলে কোনো ফরাসি খেলোয়াড় নেই, তারপরও তারা দারুণ খেলছে।'
এই মন্তব্যের পর ফ্রান্সের একাধিক শীর্ষ রাজনীবিদ তার বিরুদ্ধে বর্ণবাদী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
রোববার ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ মারিয়ানো রাহয়ের মন্তব্যকে 'সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য' বলে আখ্যা দেন। ফরাসি টেলিভিশন বিএফএম টিভিতে রাহয়ের মন্তব্য তুলে ধরা হলে নুনেজ বলেন, 'ফ্রান্স মোটেও এমন দেশ নয়। ফ্রান্স বৈচিত্র্যের দেশ, যেখানে প্রত্যেকে নিজের জায়গা খুঁজে নিতে এবং বিকশিত হতে পারে।'
ফ্রান্সের সমাজতান্ত্রিক পার্টির নেতা অলিভিয়ে ফোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, 'ফ্রান্স দলের সব খেলোয়াড়ই ফরাসি। ফ্রান্স কোনো জাতিগত রাষ্ট্র নয়; এর কোনো নির্দিষ্ট গায়ের রং বা ধর্ম নেই। এটি প্রজাতন্ত্রের মূলনীতিকে ধারণ করা একটি রাজনৈতিক জাতি। বর্ণবাদী উগ্র ডানপন্থীদের জন্য সেটিই সবচেয়ে অস্বস্তিকর।'
ফ্রান্সের ওভারসিজ টেরিটরিজবিষয়ক মন্ত্রী নাইমা মুতশু রাহয়ের মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, 'ফ্রান্সের প্রতিটি জয়ের পর একই ধরনের বর্ণবাদী অপমান ও সংকীর্ণ মানসিকতা আবারও সামনে আসে। এগুলো বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়, বরং ফ্রান্স এবং তার মূল্যবোধের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও স্বাভাবিককৃত বিদ্বেষের প্রকাশ।'
তিনি এ মন্তব্যের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনকে (এফএফএফ) আহ্বান জানান।
রাহয়ের মন্তব্যের সমালোচনা হয়েছে স্পেনেও। দেশটির পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে তাকে 'ফ্রাঙ্কো-পরবর্তী যুগের এক নির্বোধ' বলে উল্লেখ করেন এবং নিজেকে 'মধ্যপন্থী' হিসেবে উপস্থাপনের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
রোববারই মাদ্রিদে ফরাসি দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানায়, 'বিতর্কে না গিয়েও একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—ফ্রান্স জাতীয় দলের সব খেলোয়াড়ই ফরাসি। ২৬ সদস্যের দলে ২৩ জনের জন্ম ফ্রান্সে। বাকি তিনজন বিদেশে জন্ম নিলেও তারাও ফরাসি নাগরিক।'
ফরাসি দৈনিক লে মঁদ তাদের এক সম্পাদকীয়তে রাহয়ের মন্তব্যকে 'বর্ণবাদী' বলে উল্লেখ করে লিখেছে, বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই ফ্রান্স জাতীয় দল একাধিক বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হয়েছে।
ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফিলিপ দিয়ালোও রাহয়ের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেন, 'মারিয়ানো রাহয়ের মন্তব্যে বর্ণবাদের অসহনীয় গন্ধ রয়েছে। এমন মন্তব্য কী ধরনের ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করছে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের খেলোয়াড়দের কোনো সাবেক স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ফরাসি হওয়ার সনদ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ফ্রান্স জাতীয় দলই ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করে।'
এ ধরনের ঘটনা কি আগেও ঘটেছে?
চলতি সপ্তাহেই ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পেকে নিয়ে বর্ণবাদী মন্তব্যের জেরে প্যারাগুয়ের সিনেটর সেলেস্তে আমারিয়ার বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব পাস করেছে দেশটির সিনেট। প্রস্তাবে তার বক্তব্যকে 'বৈষম্যমূলক ও বর্ণবাদী' বলে উল্লেখ করা হয়।
৬১ বছর বয়সী আইনজীবী আমারিয়া ৪ জুলাই বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে প্যারাগুয়ের হারের পর এমবাপ্পেকে 'ঔপনিবেশিক ক্যামেরুনিয়ান' বলে আখ্যা দেন।
এর আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমবাপ্পেকে কটাক্ষ করেছিলেন তিনি। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরলান্দো গিলের সামনে এমবাপ্পের উদ্যাপনের একটি পোস্ট শেয়ার করে তিনি লিখেছিলেন, 'বর্বরটা ঠিকমতো লেখাপড়াও শেখেনি। মায়ের দুধের বদলে নারকেলের দুধ খেয়ে বড় হয়েছে, আর জীবনে সবচেয়ে শিক্ষিত প্রাণী হিসেবে শিম্পাঞ্জিদেরই দেখেছে।'
এমবাপ্পে এসব মন্তব্যকে 'জঘন্য' ও 'বর্ণবাদী' বলে মন্তব্য করেন।
ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন (এফএফএফ) জানায়, সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের লক্ষ্যে তারা আমারিয়ার মন্তব্যের বিষয়ে সরকারি কৌঁসুলির দপ্তরে অভিযোগ করেছে।
ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ফাবিয়েন রুসেলও ফ্রান্স দলকে ঘিরে 'নোংরা বর্ণবাদ'-এর সমালোচনা করেন। তার মতে, সেলেস্তে আমারিয়া ও মারিয়ানো রাহয়ের মন্তব্য একই ধরনের বর্ণবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, 'প্রথমে প্যারাগুয়ের একজন সিনেটর, এখন স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী—দুজনেই আমাদের দুর্দান্ত ফ্রান্স দলকে উসকে দিতে প্রকাশ্য বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন। মারিয়ানো রাহয়ের নিন্দা হওয়া উচিত। লে ব্লুর পাশে আছি।'
তবে ফ্রান্স দলের খেলোয়াড়দের জাতীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ঘটনা শুধু রাহয় বা আমারিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
আর্জেন্টিনার মেন্দোসা প্রদেশের ভাইস গভর্নর হেবে কাসাদো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, 'খুব ভালো, প্যারাগুয়ে। আফ্রিকার দলটির আচরণ খুবই খারাপ। এমবাপ্পেকে আমি সহ্য করতে পারি না।'
পরে তিনি আর্জেন্টাইন সাংবাদিক দামিয়ান দি পাসের একটি পোস্টও শেয়ার করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, 'ফ্রান্স যদি বিশ্বকাপ জেতে, তাহলে সৎভাবে ট্রফিটি আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনকে দিয়ে দেওয়া উচিত।'
এসব মন্তব্যের পর আর্জেন্টিনায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত রোম্যাঁ নাদাল কাসাদোর বক্তব্যকে 'নিঃসন্দেহে বর্ণবাদী' বলে আখ্যা দেন এবং তাকে 'অবাঞ্ছিত ব্যক্তি' (পারসোনা নন গ্রাটা) ঘোষণা করেন।
টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লক্ষ্যে মঙ্গলবার টেক্সাসের আরলিংটনে প্রথম সেমিফাইনালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখোমুখি হবে ফ্রান্স। অন্য সেমিফাইনালে বুধবার জর্জিয়ার আটলান্টায় ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা।
