জনসমুদ্র ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন: ঢাকাকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর বানিয়েছে
আমরা অনেকেই অবাক হয়ে ভাবছি কেন এবং কীভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সমস্যা-সংকুল শহরের নিচে ঢাকার অবস্থান? বিস্ময়করভাবে, ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরও ঢাকা থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে।
বৈশ্বিক তালিকায় পাকিস্তানের করাচির ঠিক নিচে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার ত্রিপোলি ও সিরিয়ার দামেস্কের ওপরে অবস্থান করছে ঢাকা। ঢাকা এখন বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে এক ধাপ পিছিয়ে বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর হয়েছে ঢাকা। ১৭৩টি শহরের মধ্যে এক ধাপ পিছিয়ে ১৭১তম অবস্থানে নেমে গেছে আমাদের শহর।
অথচ একই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায়, এশিয়া মহাদেশে বাসযোগ্যতার সবচেয়ে বড় উন্নতি রেকর্ড করা হয়েছে। অবকাঠামো খাতে সবচেয়ে কম স্কোর পেয়েছে ঢাকা, ১০০ নম্বরের মধ্যে মাত্র ২৭।
তালিকার তলানিতে থাকা শহরগুলো হলো তেহরান, হারারে, কিয়েভ, পোর্ট মোর্সবি, লাগোস, আলজিয়ার্স, করাচি, ঢাকা, ত্রিপলি ও দামেস্ক। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শহরের মতো কোনো যুদ্ধ বা সংঘাতজনিত ধাক্কা না থাকা সত্ত্বেও, ঢাকার অবস্থান অবস্থান তলানিতে। এটা বিস্ময়কর মনে হলেও, এর ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে বাসযোগ্যতা সূচক কীভাবে তৈরি হয়, সেদিকে।
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর হলেও, যদি সেটি মানদণ্ডে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট সূচকগুলোতে তুলনামূলকভাবে ভালো স্কোর করে, তাহলে সেই শহরও কখনো কখনো ঢাকার চেয়ে উপরে থাকতে পারে।
ইআইইউর বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে মূলত পাঁচটি প্রধান খাতের অধীনে, ৩০টিরও বেশি গুণগত ও পরিমাণগত নির্দেশক ব্যবহার করে, বিশ্বের ১৭৩টি শহরের জীবনযাত্রার মান মূল্যায়ন করা হয়। এই খাতগুলো হলো–স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো।
তাহলে দেখি এই সূচকগুলোর মধ্যে আমরা কোনটিতে ভালো করতে পারছি? দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি হলেও আমাদের নগরায়ন অপরিকল্পিত। এখানে পর্যাপ্ত রাস্তা, উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, খেলার মাঠ, গাছগাছালি, ফুটপাত, ড্রেনেজ কিছুই ঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
ঢাকার বায়ুদূষণ প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে খারাপগুলোর মধ্যে থাকে। শহরের ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলা, পুরোনো যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার বর্জ্য ও নির্গমণ, রাস্তার আবর্জনা ও কফ-থুথু শিশুসহ সবার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বাতাসে সীসার পরিমাণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশ্বের অন্যতম যানজটপূর্ণ শহর এই ঢাকা। আমাদের কর্মঘণ্টার বড় অংশ রাস্তায় নষ্ট হয়, এতে উৎপাদনশীলতা কমে এবং মানসিক চাপ বাড়ে।
জরুরি সেবা অ্যাম্বুলেন্স, সেবা সুবিধা, ফায়ার সার্ভিস পাওয়াটা বাধাগ্রস্ত হয়। আমাদের আবাসনের ব্যয় বেশি। ঢাকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল স্কোর সাধারণত অবকাঠামো, পরিবেশ, এবং স্থিতিশীলতা-সংক্রান্ত সূচকে দেখা যায়, আর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো হলেও তা সামগ্রিক অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
ঢাকা যে অবাসযোগ্য শহরের তালিকায় আটকে আছে, এর কারণ হচ্ছে শহরটির দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত ও পরিবেশগত দুর্বল অবস্থান। ঢাকার ক্ষেত্রে কয়েকটি সমস্যা স্কোর কমিয়ে দিচ্ছে যেমন—দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র যানজট, উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, সীমিত উন্মুক্ত সবুজ স্থান এবং অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ। এই সমস্যাগুলো প্রতিদিন ঢাকার কোটি কোটি মানুষের জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তালিকার শীর্ষে থাকা পাঁচ শহর হলো ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন, ভিয়েনা, মেলবোর্ন, সিডনি ও জুরিখ। টানা দুই বছর শীর্ষে আছে কোপেনহেগেন। কারণ শহরটি স্থিতিশীলতা, শিক্ষা ও অবকাঠামোয় ১০০ তে ১০০ পেয়েছে। পাশাপাশি, সংস্কৃতি ও পরিবেশ স্কোরেও ওপরের দিকেই ছিল এই শহরটির অবস্থান।
একটি কথা সূচকে আসে না, আলোচনাতেও আসছে না, সেটা হচ্ছে উচ্চহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। এই অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে যখন শিক্ষা, সুযোগ, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, ও কাজের সুযোগ দেওয়া যায় না, তখন সার্বিক উন্নয়ন সূচকে এগুলো প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা পুরোপুরি প্রযোজ্য।
আমরা সবসময় বলি উন্নতির জন্য সমন্বিত গণপরিবহন সম্প্রসারণ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, আধুনিক ড্রেনেজ, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার ও সবুজ এলাকা বৃদ্ধি করা দরকার। পাশাপাশি ঢাকার ওপর চাপ কমাতে অন্যান্য শহরে কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে।
নগরবিদ, পরিবহন বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য গবেষক এবং নগর অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, একটি ভালো নগর কেবল উঁচু ভবন, প্রশস্ত রাস্তা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করে না; বরং এমন একটি শহর যেখানে মানুষ নিরাপদে, স্বাস্থ্যকর পরিবেশে এবং সহজে দৈনন্দিন জীবনযাপন করতে পারে।
নগরবিদদের মতে, শহর তখনই টেকসই হয় যখন বিভিন্ন আয়ের মানুষ সেখানে বসবাস করতে পারেন। উন্নত ড্রেনেজ, জলাধার সংরক্ষণ, গাছপালা দরকার। আমাদের শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, পলিথিন-আবর্জনা দিয়ে সব নালা নর্দমা বন্ধ। এইসব মেরামতে ঢাকায় বসবাসকারীদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। একটি শহরের সাফল্য শুধু অবকাঠামোর ওপর নয়, বরং কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি, নির্ভরযোগ্য সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরেও নির্ভর করে।
এইভাবে চললে ঢাকা খুব দ্রুত একটি মৃত নগরীতে পরিণত হবে। বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর হিসেবে ঢাকার নাম এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
ধারণ ক্ষমতার চেয়ে শতভাগ বেশি মানুষের বাস এই শহরে। যেখানে ৪০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ মোটামুটি আরামে থাকতে পারার কথা, সেখানে বাস করছি প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ। শুধু কি মানুষ? মানুষকে কেন্দ্র করে ভবন, দোকানপাট, শপিংমল, হোটেল, প্রাইভেট কার ও মটরসাইকেলের সংখ্যাও বেড়েছে দেদার। বাড়েনি রাস্তার সংখ্যা, শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের থাকার ব্যবস্থা, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, পাবলিক টয়লেট, পয়:নিস্কাশন সুবিধা, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা। নগর পরিকল্পনা রীতিমত ভেঙে পড়েছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, রাস্তার গতি কেন যুক্তরাষ্ট্রে বেশি, বাংলাদেশে কম? শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের শহরে গতি কম। অন্যান্য দরিদ্র দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গতি গড়ে ২০ শতাংশ কম। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন গবেষকেরা।
গবেষণাতে যানজট ও নগরীর অব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা ধরনের কথা উঠে এলেও, এটাও বলা হয়েছে নগরীর অস্বাভাবিক লোকসংখ্যা নগরী গুছানোর ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়। ঢাকার ক্ষেত্রে যা শতভাগ সত্য। ঢাকায় মানুষ একবার পড়াশোনা বা কাজ করতে এলে আর ফিরে যেতে চায় না।
এই 'তিলোত্তমা ঢাকা' শহরে আমরা যারা বাস করি, তারা সকাল থেকে রাত অব্দি বিভিন্ন কারণে নাকাল হচ্ছি। যানজট ছাড়াও আছে শব্দদূষণ, গাড়ির হর্ন, সাইলেন্সার পাইপবিহীন মটর সাইকেলের শব্দ, ভিআইপি গাড়ির উচ্চ সাইরেন, মানুষের চিৎকার, চেঁচামেচি, ঝগড়া, আতশবাজির শব্দ, মাইকের আওয়াজ, থুথু, পানের পিক, ও বিভিন্ন ধরনের ময়লা।
অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের পরিচালক গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোঃ হাদিউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলছেন, "ঢাকা শহরের হৃৎস্পন্দন ভয়াবহভাবে কমে গেছে। গাড়ির ঘণ্টাপ্রতি গতি, একজন সুস্থ মানুষের হাঁটার গতির চাইতেও কম। হাঁটার মতো ফুটপাতও নেই বা দখল হয়ে গেছে।"
এই জনসমুদ্র ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে ঢাকাকে কি আদৌ রক্ষা করা সম্ভব? নতুন করে, নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। বারবার কেন আমাদের দেশ উন্নয়ন সূচকের নিচে পড়ে যাচ্ছে। অপ্রিয় হলেও সত্য ঢাকা এখন বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
- বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
