শেয়ারবাজার ধসের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী
শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
একই সঙ্গে অতীতের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে আরও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত কি না, তা উদ্ঘাটনে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে এটি উত্থাপিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান পরিচালনা করেছে। এতে কয়েকজনকে চিহ্নিত করে মামলা দায়েরসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এ কেলেঙ্কারির সঙ্গে আরও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে কি না, তা উদ্ঘাটনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।'
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনের কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, 'বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞ, বিনিয়োগকারী সংগঠন এবং তদন্তকারী সংস্থার অনুসন্ধানে বাজার কারসাজি, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানো, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), বন্ড ও অন্যান্য ইস্যুতে অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ, বাজারে আস্থার সংকট, নীতিগত অসঙ্গতি এবং পুঁজিবাজারবান্ধব করনীতির অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী জানান, শেয়ারবাজারে কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মোট ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা জরিমানা করেছে। এছাড়া তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, 'সরকার শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্যে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসার এবং একটি উন্নত ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।'
প্রধানমন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে দক্ষ ও অভিজ্ঞ চেয়ারম্যান এবং তিন কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে বিএসইসির নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন কমিশন বাজারে বিদ্যমান সর্বনিম্ন মূল্যস্তর (ফ্লোর প্রাইস) প্রত্যাহার করেছে।
এ ছাড়া সরকারি সিকিউরিটিজ—ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল ও সরকারি সুকুক (ইসলামি বন্ড)—স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ তৈরি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান জানান, সরকারের কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে—লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত, বহুজাতিক ও ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তিতে উৎসাহ দেওয়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনা, তথ্যদাতাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বাজার মধ্যস্থতাকারীদের নিরীক্ষায় অডিটর (নিরীক্ষক) প্যানেল গঠন, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ (এফপিআই) সহজ করতে অনবোর্ডিং পোর্টাল (নিবন্ধনের অনলাইন মাধ্যম), ওয়ান-স্টপ কাস্টডিয়ান (একক কাস্টডিয়াল) সেবা, মূলধনি মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) কমানো, লভ্যাংশ আয়ে দ্বৈত কর প্রত্যাহার এবং বিও হিসাব ও মূলধন প্রত্যাবাসন ডিজিটাল করা।
পাশাপাশি পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা দায়েরের বিধান, পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন ও বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন, ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার, ইলেকট্রনিক গ্রাহক পরিচিতি (ই-কেওয়াইসি) ভিত্তিক অনলাইন বিও হিসাব ও ব্যবসায়িক লেনদেন (ট্রেডিং) সুবিধা, বিনিয়োগবান্ধব করনীতি প্রণয়ন, ব্যাংক ও মুঠোফোন আর্থিক সেবা (এমএফএস)-এর মাধ্যমে বিও হিসাবে অর্থ জমা ও উত্তোলনের সুবিধা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) নজরদারি জোরদার, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল শক্তিশালী করা, আইন আধুনিকায়ন এবং ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল ও সরকারি সুকুকের লেনদেনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।
