সিএসআর ফান্ড থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা নৈতিকভাবে ঠিক ছিল মনে করি: আহসান এইচ মনসুর
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো ছিল জুলাই আন্দোলনের সংস্কারগুলোকে বৈধতা দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। সরকারের কোনো প্রস্তাবের পক্ষে প্রচারণা চালানো অপরাধ নয়; বরং এটি সরকারের নৈতিক দায়িত্বের অংশ।
বুধবার খালেদ মুহিউদ্দিনের অনুষ্ঠান 'ঠিকানায়' দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংকট, রাজনৈতিক চাপ এবং সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
গণভোটের প্রচারণায় ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, "ব্যাংকগুলোর সিএসআর ফান্ড থেকে এ প্রচারণায় অর্থ ব্যয় করাকে আমি 'নৈতিকভাবে ঠিক' মনে করি। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়া হয়নি। বরং ৩২ দফা সংস্কার প্রস্তাবের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি না, সেটিই জানতে চাওয়া হয়েছিল। এ প্রচারণায় আমি কোনো ক্ষতিকর দিক দেখি না।"
রাজনৈতিক চাপ ও ঋণ খেলাপিদের পুনর্গঠনের সুযোগ
আহসান এইচ মনসুর বলেন, অতীতে ব্যাংকিং খাত ব্যাপক রাজনৈতিক চাপের মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। তার দাবি, রাজনৈতিক ভিকটিমাইজেশনের কারণে ঋণ খেলাপি হয়ে পড়া অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ পুনর্গঠন বা রিস্ট্রাকচারিংয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পান।
তিনি বলেন, "এ সুবিধাভোগীদের মধ্যে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদও ছিলেন, যাদের কেউ কেউ বর্তমানে মন্ত্রী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন।"
নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঋণ পরিশোধে সমস্যা দেখা দেয়।
তিনি আরও বলেন, "এই সুবিধা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য ছিল না। ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ—সবার জন্যই সমানভাবে উন্মুক্ত ছিল। এমনকি এস আলম বা সালমান এফ রহমানের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও যদি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করত, তবে তারাও এ সুবিধা পেতে পারত।"
'২০১৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে ডকুমেন্টেড ডাকাতি হয়েছে'
আহসান এইচ মনসুর জানান, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংককে কার্যত একটি 'খোলস ব্যাংকে' পরিণত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, "ব্যাংকের বাহ্যিক কাঠামো ঠিক থাকলেও এর প্রকৃত সম্পদ ও আমানতকারীদের অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।"
পাচারের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে তিনি ব্যাংকের মালিকানা কাঠামোর কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, ব্যাংকটির ৮২ শতাংশ শেয়ার এস আলম গ্রুপ ও তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ৫ আগস্টের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব শেয়ার জব্দ করে।
তিনি বলেন, "এই বিপুল শেয়ার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।"
নিজের গভর্নর থাকাকালীন সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক ও ইউসিবিএলের মতো দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছিল। তার মেয়াদে ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠে এবং ব্যাংকটি এক বছরে ২৬ হাজার কোটি টাকার নেট আমানত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
তিনি বলেন, "ইসলামী ব্যাংক আমাদের কাছ থেকে নেওয়া তারল্য সহায়তা প্রথম বছরেই পরিশোধ করতে পেরেছিল। ওই সময়ে ব্যাংকটির তারল্য প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছিল। আমরা মনে করেছিলাম, সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকটিকে আরও তারল্য সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। সে সময় পরিচালনা পর্ষদে অত্যন্ত যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।"
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে যা ঘটছে, তা এভাবে হওয়া উচিত ছিল না। ইসলামী ব্যাংককে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।"
গভর্নরের পদ থেকে কেন সরানো হয়েছিল
সাক্ষাৎকারে খালেদ মুহিউদ্দিন জানতে চান, গভর্নরের পদ থেকে তাকে কেন সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
জবাবে আহসান এইচ মনসুর বলেন, "আমি সম্ভবত এমন কিছু কাজ করছিলাম, যা তাদের কার্যক্রম বা পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, আমি দায়িত্বে থাকলে হয়তো সেটি করা সম্ভব হতো না। এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আমি নিজেই পদত্যাগ করতাম।"
তিনি আরও বলেন, "হতে পারে এসব কারণেই আমি তাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। তাই সেই কাঁটাটি তারা সরিয়ে দিয়েছে। তবে আমি মনে করি, এতে আমারই ভালো হয়েছে।"
৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অভিযোগের জবাব
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে ইসলামী ব্যাংকে ৫ আগস্টের পর ঋণ অনিয়ম ও চাকরিচ্যুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ বিষয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, "আমার জানা মতে, ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকে কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা যেতে পারে।"
কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ হাজার কর্মীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। তার দাবি, এসব নিয়োগ ছিল অনিয়মিত এবং কোনো নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই শুধু জীবনবৃত্তান্তের (সিভি) ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট এলাকার লোকজনকে চাকরি দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, পরবর্তীতে এসব কর্মীর জন্য একটি নিরপেক্ষ নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ৫ হাজার কর্মীর মধ্যে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪০০ জন উত্তীর্ণ হন এবং তাদের সরাসরি চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।
তিনি আরও বলেন, যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি, তাদের জন্যও পুনরায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং তাদেরও ব্যাংকে রাখা হয়।
আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা ও চ্যালেঞ্জ
দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, অনেক ব্যাংকের ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশ সম্পদ কার্যত লুট হয়ে গিয়েছিল।
তিনি জানান, এই পরিস্থিতি থেকে সৃষ্ট সিস্টেমিক ঝুঁকি মোকাবিলায় পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে মোট ২৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।
তার মতে, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থা জনগণের সামনে তুলে ধরা কোনো অপরাধ নয়। কারণ আমানতকারীরা তখনই বুঝতে পারছিলেন যে তারা সময়মতো তাদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না।
বাজেট ও রাজস্ব নিয়ে উদ্বেগ
বাজেট ও রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি।
তিনি ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে ৪ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, "অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী বাজেট হলে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার নেয়। এর ফলে বেসরকারি খাত ঋণ সংকটে পড়ে এবং বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।"
তিনি সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত
আহসান এইচ মনসুর বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকেই বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল।
তবে সে সময় তিনি তা বাস্তবায়ন করেননি। কারণ তার আশঙ্কা ছিল, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে ডলারের দাম অনিয়ন্ত্রিতভাবে ২০০ টাকায়ও পৌঁছে যেতে পারে।
তিনি বলেন, "আমি প্রথমে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি কঠোর করে বাজারকে স্থিতিশীল করার জন্য প্রায় ছয় মাস সময় নিয়েছিলাম। এরপর বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করা হয়।"
সাবেক গভর্নর উল্লেখ করেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ১১৮ টাকা। পরবর্তীতে তা ১২০ থেকে ১২২ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল হয়। এমনকি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর পরও ডলারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
