ব্যাংকিংখাতে আস্থা ফেরাতে দৃশ্যমান সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি: আহসান এইচ মনসুর
ব্যাংকিং খাতে কেবল দৃশ্যমান পদক্ষেপই আস্থা পুনর্গঠন এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগের ধারা টেকসই করতে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং শৃঙ্খলা রক্ষা করাকে সরকারের অন্যতম প্রধান মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আহসান এইচ মনসুর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাজেট প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, "ব্যাংকে কোনো পরিবারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রবণতা সীমিত করতে আমরা ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধনীর প্রস্তাব করেছিলাম। যদি এই সংশোধনীগুলো বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আমরা বুঝতে পারব যে সরকার একক বা পুঞ্জীভূত নিয়ন্ত্রণ কমাতে আসলেই আন্তরিক। আমরা এই সংস্কারগুলোর বাস্তব রূপ দেখতে চাই।"
"দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ব্যাংকিং খাতে হস্তক্ষেপ। একদম শুরু থেকেই আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে আসছি। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন শক্তিশালী করতে সংসদে একটি খসড়া প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদের (বোর্ড) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তখন তিনি এই খসড়াটি পরিমার্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। আমরা সংশোধিত খসড়াটি সরকারের কাছে জমা দিয়েছিলাম এবং এটি এখনও বিবেচনাধীন রয়েছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হবে এবং কেবল তখনই বাহ্যিক হস্তক্ষেপ কমানো সম্ভব হবে। হস্তক্ষেপ এমনি এমনি বন্ধ হবে না।"
"সরকার এর আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) বিলুপ্ত করার কথাও বলেছিল। খোদ অর্থমন্ত্রীও এই ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। তবে এফআইডি এখনও পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সরকার যদি হস্তক্ষেপ কমাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, তবে তাদের এই সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত।"
তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদত্যাগ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাহ্যিক প্রভাবের উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
"এ ধরনের হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা তৈরি করে এবং এর প্রভাব নিয়ে আমরা অত্যন্ত চিন্তিত। আর্থিক খাতে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আমার দৃষ্টিতে, এটি একটি অপ্রয়োজনীয় এবং নিজে থেকে ডেকে আনা সমস্যা।"
মনসুর বলেন, "ব্যাংকটি বেশ ভালোই চলছিল। এর তারল্য পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছিল। অন্য অনেক ব্যাংকের তুলনায় আমানতের প্রবৃদ্ধিও বেশ শক্তিশালী ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ১৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তাও ব্যাংকটি ইতোমধ্যে পরিশোধ করে একটি শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানে ফিরে এসেছিল।"
"এখন এই পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকটি থেকে বিপুল পরিমাণ আমানত তুলে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতি যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, তবে তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩ কোটি গ্রাহককে সেবা দিয়ে আসছে। এসব গ্রাহকদের পরিবারের সদস্যদের হিসাব করলে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি মানুষ পরোক্ষভাবে এই ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কোনো যৌক্তিকতা নেই।"
"বর্তমান অনিশ্চয়তা বহুলাংশে নিজেদের তৈরি করা। দৃশ্যমান সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে আস্থা ফিরবে এবং শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যথায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে, যা দেশ এবং পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে।"
"ব্যাংকটি পরিচালনার জন্য সরকারের উচিত একটি নিরপেক্ষ ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ করা। পর্ষদে এমন দক্ষ পেশাদারদের রাখা উচিত যারা কোনো পক্ষপাত ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে পারবেন। কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক লড়াইয়ে জড়ানোর কোনো কারণ নেই। মূল ফোকাস হওয়া উচিত ব্যাংক এবং এর আমানতকারীদের জন্য কোনটি সবচেয়ে ভালো, তার ওপর।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান অনিশ্চয়তা মূলত নিজে থেকেই ডেকে আনা হয়েছে। যদি দৃশ্যমান সংস্কারগুলো আলোর মুখ দেখে তবে আস্থা ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে; অন্যথায় পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে, যা দেশের অর্থনীতি এবং ব্যাংকিং খাতের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
"এটি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দিতার বিষয় নয়; এটি জাতীয় স্বার্থের বিষয়। সব রাজনৈতিক সমস্যাই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। এই সংকটের সমাধানও পারস্পরিক আলোচনা এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়া সম্ভব। সরকারের উচিত ব্যাংক, আমানতকারী, সামগ্রিক অর্থনীতি এবং দেশের মানুষের স্বার্থে কাজ করা। নতুন প্রশাসনের কাছ থেকে আমরা এটাই প্রত্যাশা করি" –তিনি যোগ করেন।
