বৈদেশিক ঋণ ২.৬ বিলিয়ন ডলার কমলেও বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২৫৯ কোটি ডলার কমেছে। নতুন ঋণ ছাড়ের তুলনায় পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে ডলারের বিপরীতে বিদ্যমান ঋণের মূল্যমান কমে আসায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯৩ কোটি ডলারে, যা গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১১ হাজার ৩৫২ কোটি ডলার। এর আগে সেপ্টেম্বর শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ২২২ কোটি ডলার।
বৈদেশিক ঋণের এই পতন মূলত সরকারি খাতের ঋণ কমে যাওয়ার কারণে হয়েছে। মার্চ শেষে সরকারি খাতের ঋণ পূর্ববর্তী প্রান্তিকের ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার থেকে কমে ৯ হাজার ৯১ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৈদেশিক ঋণ কমে যাওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে—বিনিময় হার পরিবর্তন, ঋণ পরিশোধ বৃদ্ধি এবং নতুন বৈদেশিক ঋণের নিট প্রবাহ কমে যাওয়া।
তিনি বলেন, বিনিময় হারের ওঠানামা বৈদেশিক ঋণের ডলারে হিসাব করা পরিমাণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ইউরোর মতো অন্যান্য মুদ্রায় নেওয়া দায় মার্কিন ডলারে কখনও বেশি বা কম দেখাতে পারে, যদিও মূল ঋণের পরিমাণ একই থাকে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, যদি একই ঋণের স্টক ভিন্ন বিনিময় হারে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে রিপোর্টকৃত পরিমাণ ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে—যা মুদ্রার ওঠানামার প্রভাব স্পষ্ট করে।
দ্বিতীয় কারণ হলো বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের মূলধন পরিশোধ শুরু হওয়া। চীন, জাপান এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়িত একাধিক প্রকল্প এখন পরিশোধ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এমআরটি লাইন-৬ এবং কর্ণফুলী টানেল—যার কারণে বকেয়া ঋণ কমছে।
তৃতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, নতুন বৈদেশিক ঋণের তুলনায় বর্তমানে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেশি হওয়ায় মোট ঋণের স্টক নেমে এসেছে।
ইআরডি কর্মকর্তা বলেন, বৈদেশিক ঋণ কমে যাওয়াকে সবসময় নেতিবাচকভাবে দেখা ঠিক নয়, কারণ এর একটি অংশ বিনিময় হার সমন্বয়ের কারণে এবং আরেকটি অংশ বিদ্যমান ঋণ বেশি পরিশোধের ফলে হয়েছে।
সামগ্রিক ঋণের স্থিতি কমলেও বাংলাদেশকে এখন থেকে আগামী বছরগুলোতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের মুখোমুখি হতে হবে। ইআরডির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন (২ হাজার ৬০০ কোটি) ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশ যেখানে মোট ৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে, সেই তুলনায় আগামী চার বছরের এই পরিশোধের চাপ অত্যন্ত বেশি।
তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। এটি চলতি অর্থবছরে বেড়ে ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন, ২০২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন এবং ২০৩০ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, আমদানি ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপের মুখে এই বাড়তি পরিশোধের চাপ দেশের সরকারি খাতের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, 'আসল বা মূল অর্থ পরিশোধ করায় সামগ্রিক ঋণের স্থিতি স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। নতুন ঋণ গ্রহণ যদি আসল ও সুদের পরিশোধকে অতিক্রম না করে, তবে ঋণের স্থিতি কমতে থাকবে, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের দায় বৃদ্ধি পাবে।'
বেসরকারি খাতের ঋণ নেওয়ার অনীহা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়িক মন্দা ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে বেসরকারি খাতেও বিদেশি ঋণের চাহিদা অনেক কমে গেছে। মার্চ শেষে বেসরকারি খাতের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলারে, যা ডিসেম্বরে ছিল ২০ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে ঋণ কমেছে ৩৮ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে অনীহার কারণে বিদেশি অর্থায়নের চাহিদা কমছে। তাছাড়া গত এপ্রিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা মার্চে ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।
এ বিষয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'যদিও গত ১০ মাসে আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে সেই তুলনায় রপ্তানি বাড়েনি। এটি নির্দেশ করে যে ব্যবসা-ভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম এখনও মন্থর রয়েছে। যার ফলে অর্থায়নের চাহিদাও বেশ কম।'
