লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকে বৈদেশিক ঋণের ছাড় ও প্রতিশ্রুতি, বাড়ছে পরিশোধের চাপ
চলতি অর্থবছর শেষ হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি থাকলেও বৈদেশিক ঋণের ছাড় ও প্রতিশ্রুতি—দুটিই বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেকে রয়েছে। অন্যদিকে বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ।
রোববার প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ৮৬৮ বিলিয়ন ডলার। তবে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে, অর্থাৎ জুলাই-এপ্রিল সময়ে ছাড় হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ২৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৫৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় অর্থছাড় কমেছে ১৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থছাড় হয়েছিল ৫ দশমিক ১৬৩ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৬ দশমিক ৭১৫ বিলিয়ন ডলার। তবে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে মাত্র ২ দশমিক ৮০৭ বিলিয়ন ডলার, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৪১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
গত অর্থবছরের একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছিল ৪ দশমিক ২৫৯ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরে প্রতিশ্রুতি কমেছে ৩৪ শতাংশ।
এদিকে চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমলেও ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েই চলেছে। গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের ৩ দশমিক ৫০৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ৩ দশমিক ৮০২ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৮ দশমিক ৪১ শতাংশ।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা মাসরুর রিয়াজ বলেন, চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কম হওয়ার অন্যতম কারণ রাজনৈতিক রূপান্তরকাল।
তিনি বলেন, "অর্থবছরের প্রায় আট মাস দেশটি একটি অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়েছে। আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া এই সরকার জানত, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হয়ে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে। ফলে তাদের কার্যকাল সীমিত ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্তে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করে।"
তিনি বলেন, "এই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন সহযোগীরা স্বাভাবিকভাবেই 'ওয়েট অ্যান্ড সি' অবস্থানে চলে যায়। নতুন সরকার উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও অর্থায়ন কৌশলে কী অবস্থান নেয়, তা বোঝার আগ পর্যন্ত তারা বড় ধরনের নতুন প্রতিশ্রুতি দিতে চায়নি। ফলে কমিটমেন্ট কমলেও চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন পুরোপুরি থেমে থাকেনি।"
মাসরুর রিয়াজ বলেন, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ যে হারে বিদেশি ঋণ নিয়েছে, তার পরিশোধ ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে এবং ২০২৪ সাল থেকে এ চাপ আরও বাড়ছে।
তিনি বলেন, "বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ কারণে সরকার ভবিষ্যতে ঋণ গ্রহণে আরও সতর্ক হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।"
তার মতে, যেসব প্রকল্পে উচ্চ অর্থনৈতিক ও মানবিক সুফল পাওয়া যাবে, সেসব প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি আগামী কয়েক বছর বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ কিছুটা সংযত রেখে ঋণ পরিশোধের চাপ সহনীয় পর্যায়ে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় পরিস্থিতি
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ১ দশমিক ৯৫২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের লক্ষ্য ছিল। তবে এপ্রিল পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ৭১০ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ঋণ ছাড়ের লক্ষ্য ছিল ১ দশমিক ৭৬৫ বিলিয়ন ডলার। তবে ১০ মাসে ছাড় হয়েছে মাত্র ৮৩৮ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলার।
ইউরোপীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ১ দশমিক ৫৭৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের লক্ষ্য থাকলেও এপ্রিল পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার।
জাপান বাদে অন্যান্য এশীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশগুলোর কাছ থেকে ১ দশমিক ৫৪১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে এপ্রিল পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ৮৯৯ মিলিয়ন ডলার।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ৮৩৮ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। এরপর রয়েছে রাশিয়া ৮২৮ মিলিয়ন ডলার, এডিবি ৭১০ মিলিয়ন ডলার, চীন ৫৩৩ মিলিয়ন ডলার, জাপান ৪২২ মিলিয়ন ডলার এবং ভারত ২৫০ মিলিয়ন ডলার।
প্রতিশ্রুতি
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ২ দশমিক ৬৮৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। তবে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি এসেছে ১ দশমিক ২৬৯ বিলিয়ন ডলার।
জাপানের কাছ থেকে ১ দশমিক ২২০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও এখনো পর্যন্ত কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ৮২০ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া গেছে ৪১৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ২৬৯ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি এসেছে এডিবির কাছ থেকে। এছাড়া বিশ্বব্যাংক থেকে ৪১৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার এবং চীনের কাছ থেকে ২৩৫ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রচলিত প্রকল্প ঋণের পরিবর্তে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা আদায়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কারণেই এখনো পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে অর্থবছরের বাকি সময়ে বাজেট সহায়তা ঋণ পাওয়ার কারণে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।
পরিশোধ
ইআরডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের আসল বাবদ পরিশোধ করেছে ২ দশমিক ৪৬৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে সুদ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১ দশমিক ৩৩৪ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে সুদ বাবদ পরিশোধ ছিল ১ দশমিক ২৯৬ বিলিয়ন ডলার।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, অতীতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অনেক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন ঋণ পরিশোধের পরিমাণও বাড়ছে।
