বাজেট ২০২৬-২৭: ২.৫১ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি যেভাবে অর্থায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাতের ব্যয় মেটাতে বাজেটের ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ১.১৬ লাখ কোটি টাকা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১.৩৫ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
বৈদেশিক ঋণের এই লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৪ শতাংশ বেশি এবং হাসিনা সরকারের পতনের আগের সর্বশেষ বাজেটে প্রাপ্ত বৈদেশিক সহায়তার চেয়ে ৬৬ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে বৈদেশিক উৎস থেকে ১.০১ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি না ফেরার পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী বাজেট সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ার কারণে, সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৬৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে গত মে শেষে বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়া গেছে মাত্র ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আরও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্তবর্তী সরকারের সময় স্থগিত থাকা বিদেশি ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নেও গতি ফিরবে। ফলে প্রকল্প সহায়তার অংশ হিসেবে বৈদেশিক ঋণ ছাড় বাড়বে বলে তারা মনে করছেন।
তারা জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজেট বাস্তবায়নের জন্য পূর্ণাঙ্গ অর্থবছর সময় পাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় স্থবির হয়ে থাকা বৈদেশিক ঋণনির্ভর বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনাও শুরু হয়েছে। তাছাড়া, বিএনপি সরকারের অনুমোদিত এডিপিতেও বেশকিছু বৃহৎ প্রকল্প জায়গা পেয়েছে। ফলে আগামী অর্থবছরে ধীরগতির বৈদেশিক ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে গতি বাড়বে এবং বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামী বৃহস্পতিবার প্রায় ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট ২.৫১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি অর্থায়নের ৪৬ শতাংশ— বিদেশি উৎস থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার, যা জিডিপির ১.৭ শতাংশ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। তিনি বলেন, ধীরগতির প্রকল্প বাস্তবায়ন, অনুমোদন ও কেনাকাটায় বিলম্ব এবং দাতাদের শর্ত পূরণে প্রশাসনিক জটিলতাই এর প্রধান কারণ।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, "এছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে, যা বৈদেশিক অর্থায়নকে সীমিত করে দিয়েছে। তাই বেশি পরিমাণ ঋণ প্রাপ্তি নির্ভর করবে দাতাদের আস্থা পুনর্গঠনের ওপর; পরিস্থিতির উন্নতি হলে কিছু উন্নয়ন সহযোগী ইতিবাচক সাড়া দিতে পারে।"
সাম্প্রতিক বৈদেশিক অর্থায়ন
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে বৈদেশিক উৎস থেকে মোট ১.০১ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এপর্যন্ত ১ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ঋণ ও ১.৬৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়া নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ, গত মে শেষে মোট ২.৬৭ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে, টাকার অংকে যা প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
ফলে সংশোধিত বাজেটে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও— এখনও লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও নিশ্চিত করতে পারেনি ইআরডি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক উৎস থেকে সরকার মোট ঋণ পেয়েছে ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, সে তুলনায় আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা।
কর্মকর্তারা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে নেওয়া বৈদেশিক ঋণ-নির্ভর অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ স্থগিত রাখে অন্তবর্তী সরকার। ফলে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আগপর্যন্ত প্রকল্প ঋণ সহায়তা তেমন ছাড় হয়নি। বাজেট সহায়তাও চলতি অর্থবছর অনেক কম এসেছে। এবার বিশ্বব্যাংক থেকে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ এবং ঋণের শর্ত বাস্তবায়ন করতে না পারায়— আইএমএফ থেকে চলতি অর্থবছরে দুই কিস্তির ১.৫৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়া যায়নি।
ইআরডি'র কর্মকর্তারা জানান, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে চলতি অর্থবছর সরকার ৩.২ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করলেও খুব বেশি সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বিকল্প হিসেবে চলমান বেশকিছু প্রকল্পের যে ঋণ এখনই ব্যবহার করতে হবে না, সে ধরণের ঋণ জরুরি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে।
এপর্যন্ত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের থেকে ১ বিলিয়ন ডলার, জাপানের কাছ থেকে ৩১৫ মিলিয়ন, এআইআইবির কাছে ২৫০ মিলিয়ন এবং ওপেক ফান্ড-এর থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার আশ্বাস পেয়েছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে পুনর্বিন্যাস করে প্রায় ২ বিলিয়নের ডলার ঋণ জরুরি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর বেশিরভাগই আগামী অর্থবছরে ছাড় হতে পারে আশা করছে ইআরডি।
প্রকল্পের গতি বাড়ানোর প্রচেষ্টা
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালককে পাওয়া যায়নি, আবার অনেককে অপসারণ করা হয়। নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগেও সময় লেগেছে, এতে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। পাশাপাশি বেশকিছু প্রকল্প সংশোধন করতে হয়েছে, যা পুনরায় কার্যক্রম শুরুতে বিলম্ব ঘটিয়েছে।
সম্প্রতি অনুমোদিত নতুন সরকারি ক্রয়নীতির কারণে, অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ দরপত্র প্রক্রিয়ায় যেতে সময় নিয়েছে। এসব কারণে বৈদেশিক অর্থায়নের অনেক প্রকল্পেই বরাদ্দ লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। এতে করে অর্থও ছাড় করেনি উন্নয়ন সহযোগীরা।
ইআরডি কর্মকর্তারা আরো জানান, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরের কিছুদিন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন স্থবির হয়ে পড়ে। এ কারণে চলতি অর্থবছর বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থ প্রাপ্তি ব্যাহত হয়।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়ে ইতোমধ্যে চলমান প্রকল্পগুলো নতুন করে পর্যালোচনার কার্যক্রম শুরু করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের চলমান প্রকল্পের সঙ্গে বৈদেশিক অর্থায়ন-নির্ভর চলমান অনেক প্রকল্পও এ তালিকায় রয়েছে। ফলে বিএনপি সরকার গঠনের পরও বৈদেশিক অর্থায়নের অনেক প্রকল্পে এখনও গতি ফেরেনি।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার হয়েছে মাত্র ৩২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা এবং তার আগের বছরে ছিল ৪৮ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা।
ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ১.২০ লাখ কোটি টাকা
আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক থেকে ১.২০ লাখ কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে পারে সরকার।
অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের কারণে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি না থাকলেও, এসব ঋণের সুদের হার বেশি। এতে সরকারের সুদ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বেসরকারিখাত পর্যাপ্ত ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এতে ঋণের সুদ হার বেড়ে যায় এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সঞ্চয়পত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তিনি বলেন, "এটি এমন এক সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগকে সীমিত করতে পারে – যখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বেসরকারি খাতের আরও জোরালো অংশগ্রহণ প্রয়োজন। যদিও বর্তমানে ঋণের চাহিদা কিছুটা কম, তবে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো অনুকূল পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছে, যা পরবর্তীতে ঋণের চাহিদা বাড়িয়ে দিতে পারে।"
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকখাত থেকে ১.০৪ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। বাজেট বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হলেও—রাজস্ব আহরণে বড় ধরণের ঘাটতি থাকায়—সংশোধিত বাজেটে ব্যাংকখাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আরও ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।
তবে আগামী অর্থবছর উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমাবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এখাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও – সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।
