ব্যাংকের আমানত ও পুঁজিবাজারের অর্থ আত্মসাতে একই গোষ্ঠী জড়িত: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী
যারা ব্যাংকের আমানত আত্মসাৎ করেছে, তারাই শেয়ারবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অর্থও আত্মসাৎ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
তিনি বলেন, "ম্যানিপুলেশন করার ক্ষমতা যদি রাষ্ট্রের হাতে থাকে, তাহলে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের করার তেমন কিছু থাকে না। একপর্যায়ে তারা ওই ব্যবস্থার সঙ্গেই মানিয়ে নিতে বাধ্য হন।"
রোববার ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত। তিনি গণমাধ্যমের ভূমিকাকে উল্লেখ করে বলেন, "আমাদের দেশের অর্থনীতিকে যতটা পাহারা দিয়েছে, তা গণমাধ্যম ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দিতে পারেনি। গণমাধ্যম তথ্যগুলো তুলে ধরেছিল বলেই আজ আমরা সেসব বিষয়ে কথা বলতে পারছি।"
তিনি আর্থিক খাতের নাজুক অবস্থার জন্য পদ্ধতিগত বা 'সিস্টেমিক' ত্রুটিকে দায়ী করেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, "ব্যাংকিং খাতের সুশাসন কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্র যদি সামগ্রিক সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে শুধু গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে এ খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।"
তিনি অভিযোগ করেন, "বিগত আমলে রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য তথ্য ম্যানিপুলেশন করা হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, শাসকগোষ্ঠী নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দিনের বেলাকে রাত এবং রাতকে দিন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এভাবে তথ্য বা কর্মদক্ষতার পরিসংখ্যান পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।"
ব্যাংকিং কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন কমিশন গঠন করছে। ব্যাংকিং খাত যেহেতু অর্থনীতির 'রক্তপ্রবাহের উৎস', তাই এ খাতেও সংস্কার আনা হবে।
দেশের অর্থনীতির ঐতিহাসিক বিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অর্থনীতির যে দ্বার উন্মোচন করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বেসরকারি খাতের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে।
তিনি পুঁজির উৎস হিসেবে শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল না থেকে পুঁজিবাজারকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
গণমাধ্যমকে সমাজের 'আয়না' হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, আয়নার মান ভালো না হলে প্রতিবিম্বও বিকৃত দেখা যায়। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি তথ্য যাচাইয়ের (ফ্যাক্ট-চেকিং) কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তার মতে, বস্তুনিষ্ঠতা ছাড়া গণমাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অধিকাংশ অর্থায়নই আসে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে। পুঁজিবাজার চাহিদামতো পুঁজি সরবরাহ করতে পারেনি এবং বন্ড বাজারও এখনো আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারেনি।
প্রবন্ধে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের সঙ্গে পুরো অর্থনীতির ভালো-মন্দ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি কার্যকর ও শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং নিয়মকানুনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
এতে আরও বলা হয়, নানা কারণে দেশের ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। এখন সেই আস্থা আরও যেন না কমে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, দেশের ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। ২০১৯ সাল থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ সংকট প্রকাশ্যে আসে। ২০২১ সাল থেকে কয়েকটি ব্যাংকও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বর্তমানে সম্মিলিত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকসহ অন্তত ১৪টি ব্যাংক চাহিদা অনুযায়ী আমানত ফেরত দিতে পারছে না। এ সংখ্যা আরও বাড়লে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে প্রবন্ধে সতর্ক করা হয়।
এতে বলা হয়, আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
