সংবিধানে দায়মুক্তি থাকলেও দায়িত্ব পালনকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্তে দুদক
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো প্রকার ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা যায় না। কিন্তু এই সাংবিধানিক দায়মুক্তি থাকা সত্ত্বেও সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদে থাকাকালেই তার বিরুদ্ধে আদালতে আর্থিক দুর্নীতি ও প্রতারণার মামলা দায়ের করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আদালত সেই মামলা আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন।
মামলা দায়েরের প্রায় ১০ মাস পর রাষ্ট্রপতির বিদায়ের পর বিষয়টি সম্প্রতি গণমাধ্যমের নজরে আসে, যা নিয়ে আইন অঙ্গনে নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক রোববার বিকেলে বিষয়টিকে সংবিধান ও আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'কোনো রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগের মামলা কোনোভাবেই হতে পারে না। এটি সংবিধান ও আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এরকম মামলা আদালত কীভাবে আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন, সেটি এক বিরাট প্রশ্নের বিষয়।'
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের দফা ২ উদ্ধৃত করে এই সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেন, 'সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, "রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তাঁহার বিরুদ্ধে কোন আদালতে কোন প্রকার ফৌজদারী কার্যধারা দায়ের করা বা চালু রাখা যাইবে না এবং তাঁহার গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য কোন আদালত হইতে পরোয়ানা জারী করা যাইবে না।'"
ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে ড. শাহদীন মালিক বলেন, 'এটি আমার মাথায় আসে না, কে এরকম মামলা করে, কোন আইনজীবী এই মামলা পরিচালনা করে এবং কোন বিচারক এ মামলা আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন।'
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজামানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
যে অভিযোগ আনা হলো
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর পক্ষে ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. আবদুচ ছামাদ বাদী হয়ে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলায় দুর্নীতি, প্রতারণা ও অবৈধ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ লুণ্ঠন ও আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে পারস্পরিক যোগসাজশে 'ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড'-এর নামে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণের অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ মোট ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় সাবেক এই রাষ্ট্রপতির পরিচয় দেওয়া হয়েছে—'ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি'র পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন'। আদালত সূত্রে এ পরিচয়ের কথা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াহেদ, চেয়ারম্যান মিস মিরফাত আরা বেগম, এস আলম গ্রুপ ও এস আলম সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ওরফে এস আলম, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন, পরিচালক আরাস্তু খান এবং পরিচালক প্রফেসর মো. নাজমুল হাসান।
আদালতের সর্বশেষ পদক্ষেপ
২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে মামলাটি আমলে নেন। একই সঙ্গে আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর তারিখ নির্ধারণ করে দেন।
রোববার (২৬ জুলাই) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সর্বশেষ গত ২৩ জুন দিন নির্ধারণ ছিল। তবে ওই দিনও তদন্ত সংস্থা দুদক কোনো প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীরের আদালত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১১ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে এমন ফৌজদারি মামলা দায়েরের বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সেরেস্তার (রেকর্ডরুম) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মামলায় তথ্য গোপন করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, 'মামলার এজাহারে আসামির তালিকায় ১২ নম্বরে মো. সাহাবুদ্দিনের নাম উল্লেখ রয়েছে। পিতার নামের বানান কাছাকাছি থাকলেও কোনো পদ-পদবি উল্লেখ ছিল না। তবে উনিই যে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি, তা আমরা কেউ জানতাম না, বিচারকও জানতেন না। যদি উনিই হয়ে থাকেন, তবে আইনজীবী ও বাদী তথ্য গোপন করেছেন। রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে তো কোনো মামলা হয় না। তাছাড়া ঘটনার তারিখ, সময় ও ঠিকানার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির তথ্যের কোনো মিল ছিল না। এ কারণেই বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি বা এড়িয়ে গেছে।'
অন্যদিকে, এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাদীপক্ষের প্যানেল আইনজীবী আব্দুল কুদ্দুস জানান, এজাহারে ১২ নম্বর আসামি সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন কি না; সেটি তার জানা নেই।
তিনি বলেন, 'আমি ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী হিসেবে মামলাটি ফাইলিং করেছি। এর বাইরে আমার কিছুই জানা নেই। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আসামিদের যে তালিকা দিয়েছে, তা ধরেই মামলা ফাইলিং করা হয়েছে।'
