সংসদে ঋণখেলাপি নিয়ে বিতর্ক: ব্যাংক খাতের সংকট নিয়ে সরকারের সমালোচনা
২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনায় ব্যাংক খাতের অব্যবস্থাপনা, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা এবং ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী দল। বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের ব্যাংক ঋণ ও 'ঋণখেলাপি' মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, "প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর), যা মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮৭ শতাংশ। অথচ চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআর ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় করতে পারেনি। এই অবস্থায় দ্বিগুণের কাছাকাছি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।"
রুমিন ফারহানা বলেন, "বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদের হার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ঋণপ্রাপ্তির সমস্যা এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে।" তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ 'ইজ অব ডুয়িং বিজনেস' সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম।
ব্যাংক খাতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, "বর্তমানে দেশের মন্দ ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। পুনঃতফসিল, অবলোপন এবং মামলায় আটকে থাকা ঋণ যুক্ত করলে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যা মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান।"
এ সময় তিনি বলেন, "ঋণখেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে বাংলাদেশে টোটাল মন্দ ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।"
পরবর্তীতে এর ব্যাখ্যায় তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সংসদ সদস্যদের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা প্রায় ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে সামান্য অর্থ পরিশোধ করে ঋণ পুনঃতফসিল করা কিংবা আদালতের আদেশের মাধ্যমে সিআইবি তালিকাভুক্তি স্থগিত রেখে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সংস্কৃতি নতুন নয়।
রুমিন ফারহানার এই বক্তব্যের পর সংসদে উত্তজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে সমর্থন জানিয়ে বলেন, "যে দল ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিয়ে সংসদে নিয়ে আসে, সেই দায় তাদেরই নিতে হবে। সংসদে যদি এত বিপুল সংখ্যক ঋণখেলাপি থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলবে। আমরা সংসদকে সার্বভৌম বলি। এখন এই সংসদে যদি আমরা ঋণখেলাপিদের ঋণখেলাপি বলতে না পারি, তাহলে কোথায় বলব? যারা জনগণের টাকা নিয়ে বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ করে না, তাদের বিষয়ে আলোচনা করাও যদি নিষিদ্ধ হয়, তাহলে জনগণের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে কীভাবে?" তিনি এই বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ না দেওয়ার জন্য স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, "আইন অনুযায়ী ঋণখেলাপি হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষিত কোনো ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে বৈধ প্রার্থী হিসেবেই বর্তমান সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন। কেউ ঋণগ্রস্ত হতে পারেন, কিন্তু ঋণখেলাপি হিসেবে সংসদকে আখ্যায়িত করা আইনগতভাবে সঠিক নয়। যাদের বিরুদ্ধে মামলা ছিল, আদালতের মাধ্যমে সেগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে বলেই তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পেরেছেন।"
বিএনপির সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনও রুমিন ফারহানার মন্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, "একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সংসদের মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। ঋণখেলাপি হয়ে কেউ সংসদে আসতে পারে না। তাই 'ঋণখেলাপিদের সংসদ' ধরনের মন্তব্য সংসদের ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এ ধরনের বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।"
বাজেট আলোচনায় রুমিন ফারহানা আরও উল্লেখ করেন, দেশে সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ। তিনি বলেন, "মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশের মালিক মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ, আর শীর্ষ ১ শতাংশের হাতে রয়েছে দেশের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।" তিনি প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন বরাদ্দেরও সমালোচনা করেন।
বাজেট বিতর্কে বিরোধী দল রাজস্ব আহরণের বাস্তবতা, ঋণনির্ভর অর্থায়ন, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের বিস্তার, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং সামাজিক খাতে কম বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সরকারপক্ষ বাজেটকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার উপযোগী বলে দাবি করে।
