সংসদে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগ জামায়াত নেতার, আপত্তিতে বক্তব্য এক্সপাঞ্জ
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মো. তাজউদ্দিন খান অভিযোগ করেছেন যে, সরকারি 'ফ্যামিলি কার্ড' দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। তবে সরকারি দলের সংসদ সদস্যের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে ওই বক্তব্যটি সংসদীয় রেকর্ড থেকে 'এক্সপাঞ্জ' (বাদ দেওয়া) করেন দায়িত্বরত ডেপুটি স্পিকার। এ নিয়ে সংসদে পয়েন্ট অফ অর্ডারে জামায়াত ও সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বাগ্বিতণ্ডা চলে।
বুধবার (১৭ জুন) বাজেট অধিবেশনের নবম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তাজউদ্দিন খান বলেন, "ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলা হয়েছে। ৪১ লাখ ফ্যামিলিকে কার্ড দেওয়া হবে। এটা হিসাব করলে ওয়ার্ড প্রতি ৯০টা করে পরিবার কার্ড পাবে। তাহলে বাকি যে দরিদ্র ফ্যামিলিগুলো আছে তাদের অবস্থাটা কী হবে? এবং এইটা পাওয়ার প্রতিযোগিতার কারণে আমরা সংবাদপত্রগুলাতে ইতোমধ্যেই দেখেছি, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রলোভনে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রলোভনে টাকা নেওয়া হচ্ছে।"
তার এই বক্তব্যের পরই পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়িয়ে তীব্র আপত্তি জানান নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য এম মাহবুবউদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, "মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য বলেছেন ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। সংসদে এভাবে কথা বলা উচিত না। সংসদে ভাষা জানতে হবে, সেভাবে বলতে হবে। বক্তব্যটা স্পষ্ট করার জন্য আমি অনুরোধ করছি।" এ সময় তিনি বিতর্কিত ওই অংশটুকু এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান।
জবাবে স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, "মাননীয় সদস্য আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, মেহেরপুর-১ আসনের সদস্য তার বাজেট বক্তব্যে বলেছেন ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই বক্তব্যটা এক্সপাঞ্জ চাচ্ছেন। হ্যাঁ, আমিও শুনেছি এরকম কথা বলেছেন। এই স্টেটমেন্টটা এক্সপাঞ্জ করা হলো।"
ডেপুটি স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়ান সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, "এক্সপাঞ্জ তো হবে যদি অসত্য তথ্য দিয়ে থাকেন, অথবা অসংসদীয় শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। আমার ধারণা তিনি এ ধরনের কোনো কথা বলেননি। কাজেই তাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হোক।"
এরপর পুনরায় কথা বলার সুযোগ পেয়ে তাজউদ্দিন খান নিজের বক্তব্যের সপক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে বলেন, "আমার আলোচনার মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে ধর্ষণের শিকার হওয়ার বিষয়টি আমি ব্যবহার করেছিলাম। মাননীয় সদস্য এম মাহবুবউদ্দিন খোকন এতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। আমার কাছে যে তথ্য ছিল তা সময়ের অভাবে দিতে পারিনি। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল ফরিদপুরের সোনাগাজী থানায় ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে ধর্ষণের একটি মামলা হয় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে। ওসি সাহেব এর প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া ২৫ এপ্রিল রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ভাঙা ইউনিয়ন পরিষদের বিএনপির সহ-সম্পাদক এনামুল হককে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এই অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কারণে।"
এ পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, "ফ্যামিলি কার্ড প্রজেক্ট শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর বা এই সরকারের নয়, এটি সারা দেশের মানুষের একটি আশার বিষয়। এই প্রজেক্ট সম্পর্কে যেহেতু একটি অভিযোগ এনেছেন এবং শুরুতে কোনো ক্লারিফিকেশন দিতে পারেননি, সে কারণে ধর্ষণের অভিযোগের লাইনটি এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে।"
মাগরিবের নামাজের বিরতির পর আবারও বিষয়টি নিয়ে পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়ান রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, "যে ঘটনা ঘটছে এটা তো পত্র-পত্রিকায় একেবারে ব্যাপকভাবে এসেছে। এটার জন্য একটি দলের নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং অন্য জায়গায় গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কাজেই ঘটনাটি তো অসত্য নয়। তাজউদ্দিন সাহেব ফ্যামিলি কার্ডের বিরুদ্ধে বলেননি, বরং ফ্যামিলি কার্ডকে ব্যবহার করে এই অপকর্ম করা হয়েছে সেটি বলেছেন। এটি এক্সপাঞ্জ হওয়ার মতো বিষয় নয়।"
উত্তরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, "তাজউদ্দিন খান যখন স্টেটমেন্টটি দিলেন, তখন ওই পাশের একজন সদস্য আহ্বান জানালেন যে এটি তথ্যভিত্তিক নয়। তার ভিত্তিতেই তা এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে উনি মামলা ও রেফারেন্স দিয়ে যে কথাগুলো বললেন, সেগুলো তো সংসদীয় রেকর্ডে থেকেই গেল।"
