আ.লীগের মতো বর্তমান সরকারও দুদককে শক্তিশালী করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়: রুমিন ফারহানা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো বর্তমান সরকারও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করার ব্যাপারে মোটেও আন্তরিক নয় বলে অভিযোগ করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সোমবার (১৫ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে তিনি এসব কথা বলেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, "আমি এই দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সার্চ করে দেখছিলাম গুগল কী বলে। বাংলাদেশের দুর্নীতিতে টপ মোস্ট পেশা দুটো কোনটা? দেখলাম এক নম্বরে আছে রাজনীতিবিদদের নাম, দুই নম্বরে আছে আমলাদের নাম। কোনো রাজনীতিবিদ যখন পেশা হিসেবে লেখেন রাজনীতি, তখন আমি সঙ্গত কারণেই খুব অবাক হই। রাজনীতিবিদরা বেতন পান বা রাজনীতি করলে পয়সা উৎপাদন হয়, এটা সম্ভবত বাংলাদেশের মতন দেশেই সম্ভব।"
বিগত সরকারের আমলের বিভিন্ন দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমরা বিগত সরকারের আমলে ছাগলকাণ্ড দেখেছি, বালিশ দুর্নীতি দেখেছি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সময় যে ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে সেটাও দেখেছি। আমরা দেখেছি একজন পিয়ন কী করে ৪০০ কোটি টাকার মালিক হয় এবং হেলিকপ্টার ছাড়া চলাফেরা করতে পারে না বলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন। আমরা ব্যাংক থেকে লক্ষ কোটি টাকার লোপাট দেখেছি, ভুয়া কোম্পানির নামে অর্থ আত্মসাৎ, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখেছি ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং, হুন্ডি, ভুয়া রপ্তানি বিল মারফত টাকা কীভাবে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে। আমরা দেখেছি মেগা প্রজেক্ট—মেগা দুর্নীতি। আমরা দেখেছি নিয়োগ, পদোন্নতি এবং সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম। স্বাস্থ্য খাতে মিঠু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কথাও কমবেশি আমরা জানি।"
বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, "আর সে কারণেই আমাদের আশা ছিল যে ৫ই আগস্টের পরে যখন নতুন বাংলাদেশের কথা হচ্ছে, তখন দুদককে নখদন্তহীন বাঘ থেকে আমরা একটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রস্তাব দিয়েছিল, অধ্যাদেশ তৈরি করেছিল—'দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫'। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১০০-র ওপর অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ আইন করা হয় নাই।"
তিনি করেন, "সরকারের নিয়তটা কী, তা এই দুর্নীতি দমন কমিশনকে নখদন্তহীন করে রাখবার যে সংস্কৃতি—সেখান থেকে বের না হওয়ার উদাহরণ দিয়েই স্পষ্ট হয়ে যায়। এই সরকার আসলে দুর্নীতি দমন করার ব্যাপারে কতটুকু আন্তরিক? দুদককে শক্তিশালী করা হলে কেন সরকারগুলো ভয় পায়, কিছু কিছু আমরা বুঝি। সরকারে সরাসরি যুক্ত থাকে রাজনীতিবিদরা এবং পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে আমলারা। সেই কারণেই দুর্নীতি দমন কমিশন যদি শক্তিশালী হয়ে যায়, তখন রাজনীতিবিদ এবং আমলাদের জন্য খুব ভালো খবর সেটা নয়। সে কারণেই ঠিক যেভাবে একটার পর একটা ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করে নাই, একইভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারও দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে মোটেও আন্তরিক নয়।"
কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, "এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের তিনজন সদস্য কারা কারা হবেন, এটাও সরকার ঠিক করে দেবে। যদিও অধ্যাদেশের মাধ্যমে যে আইনটি করা হয়েছিল সেখানে বলা ছিল যে—প্রেসিডেন্ট দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান নির্বাচন করবেন, বাকি সদস্যদের নির্বাচন করবেন স্পিকার। সেটাও সরকারি দলের হাতেই থাকত, কিন্তু সেইটুকু করবার মতন সাহসও সরকার দেখাতে পারে নাই।"
রুমিন ফারহানার এসব বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, সরকার দুদককে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই কাজ করছে। তিনি বলেন, "দুদককে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার লক্ষ্যেই সরকার আগের অধ্যাদেশটি নিয়ে ওই সময় আর অগ্রসর না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দুদক শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং সরকার একটি শক্তিশালী ও সক্রিয় তদারকি সংস্থা গঠনের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ।"
মন্ত্রী আরও বলেন, "দুর্নীতি দমন কমিশন বিল যখন সংসদে আনা হবে, তখন সেখানে বিস্তারিত বিতর্ক ও আলোচনার সুযোগ থাকবে। এর মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের মতৈক্যের ভিত্তিতে একটি স্বচ্ছ ও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য আইনি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে।" নতুন আইন চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান আইনেই একটি 'সার্চ কমিটি' গঠন করে কমিশনের কার্যক্রম সচল রাখা হবে বলেও তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
