বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অর্থপাচার ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন বিরোধী এমপিদের
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় দেশের দুর্বল সামষ্টিক অর্থনীতি, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার, বৈদেশিক ঋণের অনিশ্চয়তা এবং সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা। তারা বলেছেন, অর্থনীতির বিদ্যমান চাপের মধ্যে সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদে সম্পূরক মঞ্জুরি দাবির ওপর দেওয়া ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় এসব কথা বলেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, শাহজাহান চৌধুরী এবং মো. আব্দুল গফুর।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ কোটি টাকা হলেও প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫ শতাংশে রয়েছে। খেলাপি ঋণ মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যার পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২২ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছে এবং ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, শ্বেতপত্র অনুযায়ী গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। এছাড়া গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির তথ্য অনুযায়ী ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে গেছে।
রুমিন ফারহানার ভাষ্য- "ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। দৃশ্যমান ব্যবসা নেই এমন ব্যক্তিদের ঋণ দেওয়া হয়েছে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সুদহার ও ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে পুরো আর্থিক খাতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।"
ঘাটতি বাজেটের অর্থায়ন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, "আইএমএফ জানিয়েছে আগের ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি নতুন সরকারের জন্য বহাল থাকবে না, নতুন করে চুক্তি করতে হবে। ফলে আমাদের হয়তো চীন বা অন্য কোনো দেশের দিকে তাকাতে হবে। কিন্তু এডিবি, বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের বাইরে নেওয়া ঋণের সুদের হার বেশি এবং দ্রুত পরিশোধের চাপ থাকে। এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে অর্থমন্ত্রী কীভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন।"
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, অর্থপাচার এবং রপ্তানি খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, "শ্বেতপত্রে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে আমরা আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি, কিন্তু রপ্তানি বাড়ছে না। ফলে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে।"
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, বাজেটে সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বরাদ্দ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে যাওয়ায় প্রকৃত উপকারভোগীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পান না।
তিনি অর্থ বিভাগের দাবিকৃত অতিরিক্ত বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব দেন।
অন্যদিকে কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল গফুর অতিরিক্ত বরাদ্দ অনুমোদনের বিরোধিতা করে বলেন, এটি সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলার ঘাটতি এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, "বাজেট প্রণয়নের সময় প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সীমার মধ্যে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় এখন অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। শুরু থেকেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে ব্যয় করা হলে জনগণের টাকার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন হতো না।"
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণ।
তার ভাষায়, "চাল, ডাল, তেলসহ প্রায় সব পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বাজারে সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চলছে। কিন্তু কার্যকর বাজার তদারকির পরিবর্তে সরকার অতিরিক্ত বরাদ্দ চাইছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমি সরকারকে প্রশ্ন করতে চাই, অতিরিক্ত যে বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে তার কতটুকু বাজার মনিটরিং বা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে ব্যয় হবে? বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু বরাদ্দ বাড়ানো হলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই ঋণের বোঝা বাড়বে।"
আব্দুল গফুর সম্পূরক বাজেটের অর্থ কমিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তুকি খাতে স্থানান্তরের প্রস্তাব দেন।
