ছয় দাবিতে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি, দাবি না মানলে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা
ছয় দফা দাবি আদায়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। দাবি পূরণ না হলে সারা দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে 'কমপ্লিট শাটডাউন' কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
সোমবার সকাল ৮টা থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। এর আগে টানা দুই দিন মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন তারা। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মূল ভবনের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়।
ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, "বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের কথা বিবেচনায় রেখে প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা সচল রাখা হয়েছে। শুধু ইন্টার্ন চিকিৎসকেরাই এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তবে আমাদের দাবি আদায় না হলে প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকেরাও আন্দোলনে যোগ দেবেন।"
তিনি বলেন, দাবি পূরণ না হলে প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের নিয়ে 'কমপ্লিট শাটডাউন' কর্মসূচি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, "রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্ব পালনকারী ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কর্মবিরতিতে থাকায় হাসপাতালে আংশিকভাবে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব আরও বাড়বে।"
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আমরা চাই না চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ুক, সাধারণ রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ুক। আমরা আশা করছি, তার আগেই সরকার আমাদের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নেবে।"
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিভিন্ন যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে কর্মসূচি আরও কঠোর করা হবে বলেও জানান তারা।
কর্মবিরতির ফলে চমেক হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বিভাগে চিকিৎসাসেবা আংশিকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন টিবিএসকে বলেন, "সারাদেশেই ইন্টার্ন চিকিৎসকদের এই আন্দোলন চলছে। ইতোমধ্যে সরকার দুটি দাবি মেনে নিয়েছে। বাকি চারটি দাবি নিয়ে তারা আন্দোলন করছেন। এতে কিছুটা স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হলেও 'কমপ্লিট শাটডাউন' হলে চিকিৎসাসেবা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে। তবে এমন কর্মসূচির আগেই সরকার একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে বলে আশা করছি।"
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের তথ্যমতে, সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এফসিপিএস (ফেলোশিপ অব কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস) প্রশিক্ষণসংক্রান্ত একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই সিদ্ধান্তে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিছু বিভাগে নতুন পদায়ন বন্ধ, উপজেলায় দুই বছর বাধ্যতামূলক সেবাদান এবং মেধাভিত্তিক সীমিত ভাতা প্রদানের বিধান রাখা হয়।
এসব সিদ্ধান্তকে চিকিৎসক সমাজের জন্য বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক দাবি করে গত বৃহস্পতিবার থেকে আন্দোলন শুরু করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।
আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, তাদের ছয় দফা দাবির মধ্যে প্রথম দাবির বিষয়ে আংশিক অগ্রগতি হলেও বাকি দাবিগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে আন্দোলন আরও জোরদার করার অংশ হিসেবে কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবির মধ্যে রয়েছে— স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের গত ১৯ মে জারি করা এফসিপিএস প্রশিক্ষণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নতুন নির্দেশনা জারি, স্বাস্থ্যকর্মী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তার বাস্তবায়ন, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মাসিক ভাতা ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং সরকারি চিকিৎসকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়ন।
এ ছাড়া বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৪ বছর নির্ধারণ, বিএমডিসি আইন-২০২৫-কে অধ্যাদেশের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তর, ভুয়া চিকিৎসক পরিচয়দানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং বিএমডিসি ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ভর্তি পরীক্ষার ফি এক হাজার টাকার মধ্যে নির্ধারণের দাবিও জানানো হয়েছে।
তবে আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার পর উপজেলায় প্রশিক্ষণ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে এফসিপিএস প্রথম পর্বে উত্তীর্ণ বেসরকারি প্রশিক্ষণার্থীরা বিসিপিএস স্বীকৃত সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নিলে ভাতার আওতায় আসবেন।
চমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাকিব হোসেন বলেন, "আমরা রোগীদের স্বার্থ বিবেচনা করে কর্মবিরতি পিছিয়েছিলাম। প্রশাসনকে শুরুতে ৪৮ ঘণ্টা এবং পরে আরও ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়েছি। কিন্তু আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে কর্মবিরতি পালন করতে হচ্ছে।"
তিনি বলেন, "দাবিগুলো শুধু ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নয়, দেশের স্বাস্থ্যখাতের সামগ্রিক উন্নয়ন ও চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলবে।"
