ব্যবসার খরচ কমাতে স্থানীয় সরবরাহে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমে ৪ শতাংশ হতে পারে
স্থানীয় শিল্প ও সেবা খাতের মূল কাঁচামালের বাইরে অন্যান্য সরবরাহ—যেমন প্যাকেজিং উপকরণ, অফিস স্টেশনারি এবং প্রশাসনিক ও বিপণন-সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ উৎসে কর (সোর্স ট্যাক্স) কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হতে পারে। ব্যবসার ব্যয় কমানোই এর মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) হারও ১ শতাংশ কমানো হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বাজেটে এ প্রস্তাব আসতে যাচ্ছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমবে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে ভোক্তাদের কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।"
গত মার্চে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বিভিন্ন খাতের উৎসে কর যৌক্তিক করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান বা খাতভিত্তিক মুনাফার হার বিবেচনায় নিয়ে উৎসে করের হার নির্ধারণ করা হবে, যাতে কর ফেরত (রিফান্ড) সৃষ্টির প্রয়োজন না হয়।
এনবিআরের বর্তমান ব্যবস্থায় সরবরাহের ওপর কর্তিত অতিরিক্ত উৎসে কর পরবর্তী সময়ে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। তবে বাস্তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই তা সমন্বয় করতে পারে না বা জটিল প্রক্রিয়ার কারণে করে না। ফলে সরবরাহকারীরা উৎসে কর্তিত করের অর্থ পণ্য বা সেবার মূল্যের সঙ্গে যোগ করে দেন। এতে শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বেড়ে যায়। আবার অনেকে করের চাপ এড়াতে প্রকৃত হিসাবও দেখান না।
ব্যবসায়ী ও কর বিশেষজ্ঞরা সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমানোর এ উদ্যোগকে ব্যবসাবান্ধব হিসেবে দেখছেন।
নেসলে বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক দেবব্রত রায় চৌধুরী এ উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "আমরা যাদের কাছ থেকে পণ্য বা সেবা গ্রহণ করি, তাদের বিল থেকে কর কেটে সরকারকে জমা দিই। কিন্তু যে হারে কর কাটা হয়, সেই কর সমন্বয় করতে সরবরাহকারীদের ২০ শতাংশের বেশি মুনাফা করতে হয়। বাস্তবে তা সম্ভব হয় না।"
তিনি আরও বলেন, "ফলে তারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে সেই অতিরিক্ত ব্যয় গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয়।"
তার মতে, সরবরাহ পর্যায়ে ৫ শতাংশ উৎসে করের কারণে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আটকে থাকে।
অপর এক উদ্যোক্তা জানান, নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো কর কেটে সরকারকে জমা দেয়। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত হিসাব গোপন করে কর ফাঁকি দেয়। তাদের মতে, অতিরিক্ত করের চাপই এ প্রবণতা বাড়াচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এনবিআর কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করে মুনাফার হার অনুযায়ী উৎসে কর নির্ধারণ করতে পারে। ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (ডিভিএস) চালুর ফলে আর্থিক বিবরণীতে স্বচ্ছতা বেড়েছে, তাই এখন এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া এ প্রস্তাবকে ব্যবসা ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই উপকারী বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, "আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে করপোরেট খাতের অন্যতম বড় সমস্যা—নগদ অর্থ আটকে থাকার বিষয়টি অনেকটাই সমাধান হবে।" তার মতে, অগ্রিম করের চাপ কমলে তারল্য বাড়বে, লেনদেনে জটিলতা কমবে এবং কর পরিপালনও শক্তিশালী হবে।
রাজস্ব আদায়ে এর প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদে কিছুটা রাজস্ব কমতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর পরিপালন বাড়ার ফলে সেই ঘাটতি পূরণ হবে।
তিনি আরও বলেন, "উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এ ধরনের পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।"
সরকারের আদায়কৃত আয়করের ৬০ শতাংশের বেশি বিভিন্ন খাতের উৎসে কর থেকে আসে।
তবে এর মধ্যে স্থানীয় সরবরাহ ও আমদানি পর্যায়ের এআইটি থেকে ঠিক কত আয় হয়, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি।
এনবিআর প্রকাশিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ওই বছর স্থানীয় পর্যায়ে ১৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা এবং আমদানি পর্যায়ে ১১ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা কর আদায় হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর বড় একটি অংশ ৫ শতাংশ হারে আদায় করা উৎসে কর।
