গ্রীষ্মে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়ে যায়—কিন্তু কেন?
বাংলাদেশে মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গরম আবহাওয়া থাকে। এই সময়ে মানুষকে লোডশেডিং, নির্ঘুম রাত, বাসের ভিড় এবং ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে লড়াই করতে হয়।
কিন্তু গরমের এই অস্বস্তির আড়ালে পুলিশের নথিতে একটি অন্য চিত্রও উঠে এসেছে: এই সময়ে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা মৌসুমভিত্তিক (সিজনাল) হারে বেড়ে যায়।
নারী ও শিশু নির্যাতনের এই মামলাগুলোর মধ্যে পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পাচার, যৌতুকের কারণে নির্যাতন এবং বাল্যবিবাহের মতো ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ পুলিশের ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাসিক অপরাধের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট মৌসুমে এই অপরাধগুলো বেড়ে যায়। সাধারণত মার্চ বা এপ্রিলের দিকে এসব মামলার সংখ্যা বাড়তে শুরু করে, পুরো গ্রীষ্ম ও বর্ষার মাসগুলোতে তা বেশি থাকে এবং বছরের শেষের দিকে তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে এই হারও কমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌসুমভিত্তিক অর্থনৈতিক সংগ্রাম, চরম আবহাওয়ার কারণে তৈরি হওয়া শারীরিক ও মানসিক চাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো বাংলাদেশে গরমের সময় নারী ও শিশু নির্যাতন বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জীবিকা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
২০২১ সালে ফেব্রুয়ারিতে এ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫৯৭টি। জুনে তা বেড়ে ২ হাজার ২৬৮-তে পৌঁছায় এবং ডিসেম্বরে কমে ১ হাজার ৪২৬-এ দাঁড়ায়। ২০২২ সালেও একই চিত্র দেখা গেছে—ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪৫৪টি থেকে আগস্টে মামলা বেড়ে ২ হাজার ২১৫টি হয় এবং শীতকালে এর সংখ্যা কমে যায়।
২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেও আগের বছরগুলোর মতো একই প্রবণতা দেখা গেছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মামলার সংখ্যাও বেড়েছে। জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১টি মামলা রেকর্ড করা হয়, যা ফেব্রুয়ারিতে সামান্য কমে ১ হাজার ১৮১টিতে দাঁড়ায়। কিন্তু মার্চে তা আবার বেড়ে ১ হাজার ৪৮৫টি হয়।
২০২৬ সালের এপ্রিলে এই সংখ্যা এক লাফে ২ হাজার ১১টিতে পৌঁছায়, যা মার্চের তুলনায় ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। বছরের শুরুর দিকের মাসগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম সর্বোচ্চ সংখ্যা, যা আগের বছরগুলোর মৌসুমভিত্তিক হারবৃদ্ধির প্রবণতার সঙ্গে মিলে যায়।
২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা রেকর্ড করা হয়েছিল ২০২১ সালের জুনে। ওই মাসে পুলিশ ২ হাজার ২৬৮টি মামলা নথিভুক্ত করে। আর সবচেয়ে কম মামলা হয়েছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে (১ হাজার ৪৩টি)।
বৈশ্বিক গবেষণার সঙ্গে মিল
বিভিন্ন দেশের গবেষকেরাও দেখেছেন যে গরমের সময়, বিশেষ করে গ্রীষ্মের মাসগুলোতে মানুষের মধ্যে আন্তব্যক্তিক সংঘাত বেড়ে যায়।
২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিতে সঙ্গীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা প্রায় ৪.৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
'জ্যামা সাইকিয়াট্রি' জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ—ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষকেরা দেখেছেন, তাপমাত্রা বেশি থাকলে শারীরিক ও যৌন সহিংসতার হার আরও বেশি বাড়ে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার সময় শারীরিক সহিংসতা প্রায় ৮ শতাংশ এবং যৌন সহিংসতা ৭.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত গরমের কারণে মানুষের মানসিক চাপ, শারীরিক উত্তেজনা, বিরক্তি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে যেসব পরিবারে ঘর ঠান্ডা রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, সেখানে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু উষ্ণায়ন এভাবে চলতে থাকলে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না গ্রহণ করলে চলতি শতাব্দীর শেষের দিকে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এ ধরনের পারিবারিক সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে।
২০২৪ সালে 'এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পার্সপেক্টিভস'-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে সাধারণত সহিংসতার ঝুঁকি ৯ শতাংশ বেড়ে যায়। ১৬ হাজারেরও বেশি গবেষণাপত্র যাচাই করে বাছাই করা ৮৩টি গবেষণার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই ফল পাওয়া গেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, গরমের কারণে মানুষের শারীরিক অস্বস্তি, মানসিক চাপ, বিরক্তি এবং আবেগপ্রবণ আচরণ বেড়ে যায়। এটি মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন যে তাপমাত্রাকেই সহিংসতার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি এমন একটি পরিবেশগত প্রভাবক, যা সমাজে আগে থেকে থাকা সামাজিক ও আচরণগত বিষয়গুলোকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
চরম আবহাওয়ার প্রভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনারারি অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ জানান, মৌসুমভিত্তিক পরিবেশগত পরিবর্তন সরাসরি পারিবারিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'চরম আবহাওয়া তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের জীবিকার ওপর চাপ ফেলে। বাংলাদেশে যখন হঠাৎ তীব্র গরম পড়ে, তখন দিনমজুর, কৃষক ও রিকশাচালকেরা কাজ করতে পারেন না। এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েন খুব দ্রুত মানসিক চাপে রূপ নেয়, যা পারিবারিক সহিংসতা এবং মানুষের বাস্তুচ্যুতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।'
অধ্যাপক মাহবুবের মতে, এই পরিবেশগত চাপ পরিবারের সবচেয়ে দুর্বল সদস্যদের ওপর বেশি পড়ে। তিনি বলেন, 'আর্থিক সংকটের সময় টিকে থাকার উপায় হিসেবে শিশুদের প্রায়ই শিশুশ্রম বা বাল্যবিবাহের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।'
তিনি আরও বলেন, তীব্র দাবদাহ বা শৈত্যপ্রবাহের সময় স্কুল বন্ধ থাকে এবং শিশু সুরক্ষাসেবাগুলোও কম কার্যকর হয়ে পড়ে। এতে শিশুরা নির্যাতনের ঝুঁকির মুখে থাকে।
জলবায়ুগত কারণ ছাড়াও উচ্চ অপরাধ হারের পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন অধ্যাপক মাহবুব। তিনি বলেন, 'বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং মামলার জট বিচার ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলেছে, যা মূলত একটি পদ্ধতিগত ব্যর্থতা।' এর সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, মাদকাসক্তি এবং ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার (ভিকটিম-ব্লেমিং) প্রবণতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে বলে তিনি জানান।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অধ্যাপক মাহবুব বলেন, গ্রাম থেকে শহরে দ্রুত স্থানান্তরের কারণে প্রথাগত সামাজিক নজরদারি ভেঙে পড়েছে। তিনি বলেন, 'গ্রামে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন এবং স্থানীয় ইমামরা শিশুদের দিকে নজর রাখেন। কিন্তু শহরে এই অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ একেবারেই নেই।'
মৌসুমভিত্তিক এই আগ্রাসন কমানোর জন্য সরাসরি জৈবিক মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোর ওপর নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক মাহবুব। তিনি বলেন, 'তীব্র গরমের সময় অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার এবং গরুর মাংসের মতো রেড মিট পরিহার করে খাদ্য তালিকায় পরিবর্তন আনলে তা শরীরের বিপাকীয় তাপ ও খিটখিটে মেজাজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।'
এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাসেও পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, 'ইংল্যান্ডের শীতের জন্য তৈরি করা আইনজীবীদের ভারী কালো কোট পরাটা আমাদের এই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুতে শারীরিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়, যা কাজের পরিবেশের জন্যই একটি ঝুঁকি।'
মৌসুমভিত্তিক অর্থনৈতিক চাপ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের মতে, গরমের মাসগুলোতে নারী ও শিশু নির্যাতন বৃদ্ধির পেছনে বাংলাদেশের মৌসুমভিত্তিক অর্থনৈতিক চাপও একটি বড় কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, ফসল কাটার মূল মৌসুমের বাইরে কৃষি ও অন্যান্য মৌসুমভিত্তিক পেশায় নিযুক্ত অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েন বা কাজ কমে যায়। এর ফলে পরিবারগুলোতে বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
তিনি আরও জানান, গ্রীষ্মকালে জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণত বেড়ে যায়। অন্যদিকে শীতকাল তুলনামূলকভাবে কম অর্থনৈতিক চাপের হয়, কারণ তখন খরচ কম থাকে এবং সহজে ও সস্তায় খাবার পাওয়া যায়।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'তীব্র গরমে কৃষিকাজ, নির্মাণকাজ এবং অন্যান্য কায়িক শ্রমে যুক্ত মানুষের ওপর মানসিক প্রভাব পড়ে, যা পারিবারিক সহিংসতার মাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।'
আনুষ্ঠানিক গবেষণার তাগিদ পুলিশের
এই পরিসংখ্যান সম্পর্কে জানানো হলে বাংলাদেশ পুলিশের অ্যাডিশনাল আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বিষয়টির তাৎপর্য স্বীকার করেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে কখনো মৌসুমভিত্তিক আবহাওয়ার সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতনের সম্পর্ক নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক গবেষণা করেনি। তবে এর একটি নিয়মতান্ত্রিক মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। তথ্যগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা না করে আমরা এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না, তবে আমরা অবশ্যই এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করব।'
