আইসিইউতে হামের সঙ্গে লড়ছে সন্তান; হাসপাতালের পাহাড়সম বিলে দিশেহারা পরিবার
ঢাকায় এক বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউর (ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট) বাইরে অপেক্ষায় আছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন সাদ্দাম। ভেতরে তার সাড়ে ৫ বছর বয়সী ছেলে হামের নানা জটিলতায় জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
একই হাসপাতালের আরেক সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন তার সাড়ে ৪ বছরের ছোট্ট মেয়েটিও, একই হামে আক্রান্ত হয়ে।
প্রথমে একটি সাধারণ অসুস্থতা বা জ্বর-কাশি বলে মনে হলেও, ধীরে ধীরে তা এই পরিবারের জন্য এক বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সংকটে রূপ নেয়। একদিকে আইসিইউতে চিকিৎসা, অন্যদিকে পাহাড়সম হাসপাতালের বিল মেটাতে গিয়ে পরিবারটি এখন পুরোপুরি দিশেহারা।
বাংলাদেশে হামের রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের যে দুর্ভোগ হচ্ছে, সাদ্দামের এই পরিস্থিতি যেন তার একটি খণ্ডচিত্র। আইসিইউর মারাত্মক সংকট এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার চড়া খরচের কারণে অনেক পরিবারকেই এখন একটু সেবার আশায় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে।
সাদ্দাম জানান, গত ঈদুল ফিতরের পর পর দুই সন্তানেরই সর্দি ও জ্বর হয়েছিল। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, এটি সাধারণ সর্দি-কাশি।
সাদ্দাম বলেন, 'সবার আগে আমার ছেলের ঠান্ডা লেগেছিল। ভেবেছিলাম সাধারণ সর্দি। কিন্তু এরপরই শুরু হলো জ্বর।'
বাচ্চাদের প্রথমে ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে কিছুটা সুস্থ হয়ে তারা বাড়িও ফেরে। কিন্তু কিছুদিন পরই তাদের অবস্থা আবার খারাপ হতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যে দুজনই হামে আক্রান্ত।
আগে জ্বর আসে মেয়ের, এরপর ছেলের। বাধ্য হয়ে তাদের আবারও হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
সাদ্দাম বলেন, 'পরিস্থিতি তখনই হাতের বাইরে চলে যায়, যখন দুজনেরই একসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে।' বিশেষ করে, শিশুদের জন্য বরাদ্দ 'পিআইসিইউ' বা পিডিয়াট্রিক ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে শয্যা না পাওয়া তাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, 'সেন্ট্রাল হাসপাতালে কোনো আইসিইউ বেড না পেয়ে আমি অনেকগুলো সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ঘুরেছি, কোথাও কোনো সিট খালি ছিল না। অনেক কষ্টে পরে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটা বেডের ব্যবস্থা হয়।'
গত ৪ মে থেকে তার ছেলে এই পিআইসিইউ-তেই চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে, মেয়েকে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।
গত ১৩ মে পর্যন্ত কেবল ছেলের আইসিইউ বিলই এসেছে ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা! সাদ্দাম জানান, এর আগে সেন্ট্রাল হাসপাতালেও চিকিৎসায় প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আর এখন মেয়ের চিকিৎসায় প্রতিদিন আরও ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা করে গুনতে হচ্ছে।
নীলক্ষেতে একটি ছোট্ট স্টেশনারির দোকান চালান সাদ্দাম। কিন্তু বাচ্চাদের এই দুঃসময়ে দোকান বন্ধ রেখেই চিকিৎসার দিকে পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি।
সাদ্দাম বলেন, 'বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজন আমাকে সাহায্য করছে। আমার একমাত্র চাওয়া কোনোমতে আমার বাচ্চা দুটো বেঁচে যাক।'
অক্সিজেনের সাপোর্ট আর হাসপাতালের দীর্ঘ বিল অন্যদিকে, চট্টগ্রামে আরেকটি পরিবারও প্রায় একই রকম দুঃসহ এক পরিস্থিতি পার করছে। হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত তাদের ছোট্ট মেয়ে।
৮ মাস বয়সী শিশু সাবরিনা মেহেরিন সাইবাকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সর্বক্ষণ অক্সিজেন দিয়ে চিকিৎসা করা হচ্ছে।
সাইবার বাবা সেলিম উদ্দিন রাজু জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে প্রথমে তার মেয়ের ভীষণ জ্বর আসে এবং কাশি শুরু হয়। পরে শরীরে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
তিনি বলেন, 'মেয়ের ১০২ থেকে ১০৩ ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর ছিল। পরে দেখি সারা গায়ে ছোট ছোট র্যাশ উঠতে শুরু করেছে।'
প্রথমে কক্সবাজারের পেকুয়ায় তার চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় মেয়েকে দ্রুত চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসকরা জানান যে হামের পাশাপাশি তার নিউমোনিয়াও হয়েছে এবং তাকে সব সময় অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা প্রয়োজন।
রাজু জানান, তার মেয়ে ঠিকমতো খেতে পারছে না, টিউবের মাধ্যমে তরল খাবার খাওয়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, 'অক্সিজেনটা সামান্য সময়ের জন্য খুলে রাখলেই সে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারে না।'
চিকিৎসার এই বিশাল ব্যয় তাদের চিন্তার আরেকটি বড় কারণ। হাসপাতালের শুধু কেবিন ভাড়াই প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার টাকা, আর সব মিলিয়ে খরচ ইতিমধ্যে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ছুঁয়েছে। এখনও এক সপ্তাহের বিল বকেয়া রয়ে গেছে।
পেশায় আনসার সদস্য রাজু বলেন, চিকিৎসার এই খরচ মেটাতে তিনি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সাহায্য নিচ্ছেন। তিনি বলেন, 'খরচের কথা এখন মাথায় নেই, শুধু আমার মেয়েটা কোনোভাবে বেঁচে ফিরুক—এটাই চাই।'
আইসিইউ সংকট এবং মাত্রাতিরিক্ত খরচ নিয়ে উদ্বেগ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. এম. মুশতাক হোসেন জানান, সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার অভাব থাকায় পরিবারগুলোকে বাধ্য হয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে।
এই সংকটময় সময়ে সরকারের উচিত বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউগুলো জরুরিভিত্তিতে কাজে লাগানো। এর বিনিময়ে সরকার ওই হাসপাতালগুলোকে নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে।
ড. মুশতাক বলেন, 'যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৭-৮ জন শিশু মারা যাচ্ছে, সেটাকে অবশ্যই জরুরি অবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। যদি হেলথ ইমারজেন্সি ঘোষণা করা হয়, তবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আইনিভাবেও অনেক সহজ হয়।'
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত হাম এবং হামের মতো উপসর্গ নিয়ে মোট ৬১ হাজার ৭০০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এ বছর হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৭৪ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে, এবং প্রায় ৩৭৭ জন শিশু হামের মতো একই উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।
