তেল আসা ‘বন্ধ’ করে দিয়েছে আমেরিকা, বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির সৌর-বিপ্লব করছে কিউবা—চীনের সাহায্যে
আমেরিকার কড়া তেল-অবরোধের জেরে জ্বালানির জোগান তলানিতে। ফলে চরম বিদ্যুৎ-সংকট ও ঘন ঘন ব্ল্যাকআউটের মুখে পড়েছে কিউবা। কিন্তু এই সংকটের সুবাদেই ক্যারিবীয় রাষ্ট্রে চীনের সাহায্যে নীরবে এক পরিবেশবান্ধব জ্বালানির বিপ্লবও গতি পাচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সংক্রান্ত গবেষণা সংস্থা এমবার-এর তথ্য অনুযায়ী, চীনের হাত ধরে কিউবায় এখন বিশ্বের অন্যতম দ্রুত সৌর-বিপ্লব ঘটছে। গত এক বছরে চীন থেকে সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি আমদানির পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে দেশটিতে। পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগে কয়েক ডজন সোলার পার্কও তৈরি করে ফেলেছে কিউবা।
দেশটি এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপরেই বেশি নির্ভরশীল। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, দ্বীপরাষ্ট্রটির 'নিয়ন্ত্রণ' নেওয়ার মার্কিন হুমকি এবং প্রবল চাপই কিউবাকে পরিবেশবান্ধব শক্তির দিকে দ্রুত এগিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকা ও ব্রিটেনের যৌথ গবেষণা সংস্থা ট্রানজিশন সিকিউরিটি প্রজেক্টের অর্থনীতিবিদ কেভিন ক্যাশম্যান বলেন, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়লে জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমবে। এর ফলে 'জোর খাটানোর এই হাতিয়ারটিও ভোঁতা হয়ে যাবে'।
যদিও ভগ্নপ্রায় পাওয়ার গ্রিড ও বেহাল অর্থনীতির কারণে কিউবার বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশ খারাণ। তাই বিশেষজ্ঞদের আরেকটি অংশের মতে, বর্তমান সংকটে পরিবেশবান্ধব শক্তি খুব সামান্যই কাজে আসবে। দেশটিতে দীর্ঘ ও ভয়াবহ ব্ল্যাকআউট অব্যাহত আছে; সৌরশক্তির এই প্রসারের সুফল সাধারণ কিউবাবাসীর কাছে এখনও পৌঁছয়নি।
ওয়াশিংটন ডিসির আমেরিকান ইউনিভার্সিটি-র কিউবান অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো টরেস বলেন, 'পরিবেশবান্ধব শক্তির বিপ্লব খাতায়-কলমে শুনতে ভালো লাগলেও, তার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সম্পদ থাকা প্রয়োজন।'
কিউবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মেরুদণ্ডই হলো তেল, যার বেশিরভাগই আমদানি করা হয়। ১৯৮০-র দশকে মূলত সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তেল আসত। ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েতের পতনের পর ভেনেজ়ুয়েলার দিকে ঝোঁকে কিউবা। দুই দেশের মধ্যে এক অভিনব চুক্তি হয়—তেলের বিনিময়ে ভেনেজ়ুয়েলায় চিকিৎসাকর্মীদের পাঠাতে শুরু করে কিউবা সরকার।
চলতি বছরের জানুয়ারির গোড়ার দিকে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে নেওয়ার পর সেই তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এর কদিন পরেই আমেরিকা অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর হুমকি দেওয়ায় মেক্সিকোসহ অন্যান্য দেশ থেকেও কিউবায় তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এর প্রভাব পড়েছে মারাত্মক। মার্চে গোটা দেশে তিনবার ব্ল্যাকআউট হয়। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে প্রায় ১ কোটি মানুষ। রাস্তায় রাস্তায় আবর্জনার স্তূপ জমে যায়, হাসপাতালগুলোতে অস্ত্রোপচার ব্যাহত হয়, আর রান্নার জন্য বাধ্য হয়ে কাঠ পোড়াতে শুরু করে মানুষ।
গত কয়েক দশকের মধ্যে এটাই কিউবার সবচেয়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ-সংকট। যদিও ব্ল্যাকআউট বহু বছর ধরেই দেশটির মানুষের নিত্যসঙ্গী। বিপুল চাহিদার চাপ সামলাতে না পেরে দেশের পুরনো ও জীর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রায়ই মুখ থুবড়ে পড়ে।
২০২৪ সালে এই সংকট নতুন মাত্রা পায়। ওই বছর টানা কয়েক দিন ধরে দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট চলে। টরেস বলেন, সেটাই ছিল 'মোড় ঘোরানো' মুহূর্ত। বিদ্যুৎ-সমস্যার সমাধানে কিউবা সরকার ওই বছর থেকেই সৌরশক্তির প্রসারে জোর দিতে শুরু করে।
এই সৌর-বিপ্লবের গতি চমকে দেওয়ার মতো। এমবারের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে চীন থেকে কিউবায় প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলারের সোলার প্যানেল রপ্তানি করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৭ মিলিয়ন ডলারে।
এই পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ার অন্যতম কারণ হল চীনের সঙ্গে কিউবার চুক্তি। ওই চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সাল নাগাদ দেশজুড়ে ৯২টি সোলার পার্ক তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে মোট ২ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে, যা দিয়ে ১৫ লাখেরও বেশি বাড়িতে আলো জ্বলবে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল প্রথম সোলার পার্ক উদ্বোধন করেন। বর্তমানে গোটা দ্বীপরাষ্ট্রজুড়ে এমন প্রায় ৫০টি পার্ক চালু রয়েছে। শুধু গত ১২ মাসেই কিউবায় প্রায় ১ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞ গ্রাহাম বলেন, কিউবার আকারের দেশে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যানটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
২০২৪ সালে কিউবায় মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের মাত্র ৩ শতাংশ আসত নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ শতাংশে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার অন্তত ২৪ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে দেশটি।
কিউবার ক্ষেত্রে সৌরশক্তির সুফলগুলো স্পষ্ট। গ্রাহাম বলেন, সম্প্রতি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির খরচ অনেকটাই কমেছে। তাছাড়া সৌরবিদ্যুতের অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে দ্রুত স্থাপন করা যায়। এই অবকাঠামো কয়েক দশক টেকে এবং একবার স্থাপন করা হয়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শুধু সূর্যালোকেরই প্রয়োজন হয়।
ইউনিভার্সিটি অভ টেক্সাসের এনার্জি ইনস্টিটিউটের গবেষক হোর্হে পিনন বলেন, এতে চীনও লাভবান হচ্ছে, যা শুধু আর্থিক মুনাফার গণ্ডিতে আটকে নেই। 'এর ফলে শুধু কিউবাতেই নয়, গোটা লাতিন আমেরিকাতেই চীনের প্রতি এক ধরনের সদিচ্ছা তৈরি হবে।'
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই সৌর-বিপ্লবের প্রসারের পথে বেশ কিছু বড় বাধাও রয়েছে।
ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণে সৌরবিদ্যুৎ মিলছে না। পিনন বলেন, কিউবার সোলার পার্কগুলো আকারে ছোট এবং ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। তাছাড়া শুধু দিনের বেলাতেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ফলে সন্ধ্যায় যখন বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন সেই ঘাটতি মেটানো যায় না। ব্যাটারির সাহায্যে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। ব্যাটারি আমদানি বাড়লেও কিউবায় এখনও ব্যাপক হারে বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে রাখার মতো অবকাঠামোর অভাব রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত খরচ। সৌর-বিপ্লবের এই পথ মোটেও সস্তা নয়। পিননের বলেন, 'পুরনো, ভগ্নপ্রায় এবং জরাজীর্ণ একটি ব্যবস্থাকে প্রায় ঢেলে সাজাতে হবে।'
এপ্রিলে প্রকাশিত ক্যাশম্যানের এক বিশ্লেষণ অনুসারে, কিউবার মোট বিদ্যুতের প্রায় ৯৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে উৎপাদন করতে খরচ পড়বে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেশটিকে আর তেল বা গ্যাস আমদানি করতে হবে না। আর সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব করতে খরচ হবে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারলে মার্কিন চাপের প্রধান হাতিয়ারটি ভোঁতা হয়ে যাবে। আর দ্বিতীয় লক্ষ্য অর্জিত হলে কিউবায় শক্তির রূপান্তর সম্পূর্ণ হবে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বিপুল এই খরচের জোগান দেবে কে? পিননের প্রশ্ন: 'রাষ্ট্র প্রায় দেউলিয়া, তাদের কোষাগারে টাকা নেই। কিউবার ভোক্তাদেরও এই খরচ বহনের সামর্থ্য নেই। তাহলে আর কে রইল?'
ক্যাশম্যানের প্রতিবেদন বলছে, এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়নমূলক আর্থিক প্রতিষ্ঠানই সহায় হতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ঋণ শোধ করার সদিচ্ছা ও সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে কিউবাকে। পিনন বলেন, 'পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ এবং কিউবার হাতে এখন সেই সময়টুকুই নেই।'
চীনের সহায়তারও একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। টরেস বলেন, চীন কিউবাকে 'ব্ল্যাঙ্ক চেক' দেবে না।
অবশ্য কিউবানদের একাংশ ইতিমধ্যেই এই সৌর-বিপ্লবের সুফল পেতে শুরু করেছে। সান্তা ক্লারা শহরে দেশের প্রথম সৌরশক্তিচালিত চার্জিং স্টেশন তৈরি হয়েছে। সেখানে সাধারণ মানুষ এখন অনায়াসেই মুঠোফোন, পাওয়ার ব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক মোটরবাইকও চার্জ করতে পারছেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউডেলাইমিস ব্যারেরো মুনোজ বলেন, 'এ ব্যবস্থা বহু মানুষের অনেক সমস্যার সমাধান করেছে।' তিনি নিজেও পরিবারের বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চার্জ করার জন্য ওই স্টেশনে আসেন।
