ট্রাম্প-শি বৈঠক যেভাবে ইরান যুদ্ধ বন্ধে বড় অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হলো
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে তার প্রশাসন চীনকে চাপ দিয়ে আসছিল, যেন তারা ইরানের ওপর প্রভাব খাটায়।
তবে শুক্রবার বিকেলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শেষে ট্রাম্প যখন এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে চীন ছাড়েন, তখনও এমন কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেল না যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দেশ (যুক্তরাষ্ট্র ও চীন) ইরান যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা যায়, সে বিষয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছেছে।
ট্রাম্প-শি শীর্ষ বৈঠকে যুদ্ধ নিয়ে উভয়পক্ষ কী বলেছে, তাদের মধ্যে মতপার্থক্যগুলো কী ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা এখন কোন পর্যায়ে, সে বিষয়গুলো এখানে তুলে ধরা হলো।
সামগ্রিক চিত্র: যুদ্ধ নিয়ে কী বলেছে চীন?
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনার মধ্যেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালায়। জবাবে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এসব হামলায় ইসরায়েলের পাশাপাশি বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করেছে, এই যুদ্ধ ছিল যৌক্তিক এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া। যদিও তেহরান বহুবার বলেছে, তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের কোনো ইচ্ছা নেই। তবে চীন ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় দেওয়া এক বিবৃতিতে সংঘাতের বিরোধিতার অবস্থান আরও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের এক্স অ্যাকাউন্টে এক বিবৃতিতে বলেছে, "ইরান পরিস্থিতি নিয়ে চীনের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। এই সংঘাত ইরান ও অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জনগণের ওপর ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে এনেছে।"
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩ হাজারের বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন।
চীন বিবৃতিতে বলেছে, "পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান বের করা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের স্বার্থেই নয়, বরং আঞ্চলিক দেশগুলো এবং পুরো বিশ্বের স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ।"
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, চীন চলমান যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায়, যেখানে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে এবং তাদের বিশ্বাস, সংলাপই সামনে এগোনোর পথ। যত দ্রুত সম্ভব একটি বিস্তৃত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো জরুরি।
এতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবিত চার দফা পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়। এই পরিকল্পনায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান, যৌথ নিরাপত্তা এবং উন্নয়নভিত্তিক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে। চীন জানায়, তারা এই পরিকল্পনা অনুযায়ীই কাজ চালিয়ে যাবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উভয়পক্ষ কী বলেছে?
হোয়াইট হাউস বৃহস্পতিবার তাদের এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলে, "উভয় পক্ষ একমত হয়েছে যে জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালি খোলা থাকতে হবে।"
মার্চের শুরু থেকে ইরান ওই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো। ইরান কিছু নির্দিষ্ট দেশের জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিলেও, তাদের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে আলোচনা করে অনুমতি নিতে হচ্ছে।
যুদ্ধ বন্ধে আগের প্রস্তাবগুলোতে ইরান প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি বা টোল আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। ওয়াশিংটন বারবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরে প্রবেশ বা বের হওয়া জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। এতে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটে।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "প্রেসিডেন্ট শি স্পষ্ট করেছেন যে চীন হরমুজ প্রণালির সামরিকীকরণ এবং ব্যবহারের জন্য টোল আরোপের বিরোধী। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এই প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন আরও বেশি আমেরিকান তেল কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।"
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে স্বীকার করেছে, "এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শৃঙ্খলা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ স্বার্থের ক্ষতি করছে।"
তবে চীনের বিবৃতিতে ইরানের প্রস্তাবিত টোল বা প্রণালির সামরিকীকরণের বিষয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না।
ট্রাম্প-শি বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। চীন এমন দেশগুলোর একটি, যারা এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত উপসাগরীয় তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং একই সঙ্গে তারা ইরানি তেলের বড় ক্রেতাও।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তারা কী বলেছে?
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়, "উভয় দেশ একমত হয়েছে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারে না।"
তবে চীনের বিবৃতিতে সরাসরি বলা হয়নি যে ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। বরং সেখানে বলা হয়েছে: "পরিস্থিতি শান্ত করার ধারা বজায় রাখা, রাজনৈতিক সমাধানের পথে থাকা, সংলাপ ও পরামর্শ চালিয়ে যাওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক ইস্যুসহ অন্যান্য বিষয়ে এমন সমাধানে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ, যা সব পক্ষের উদ্বেগকে বিবেচনায় নেয়।"
ইরান কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। অতীতে চীন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলো এবং রাশিয়ার সঙ্গে মিলে বারাক ওবামা আমলের ইরান পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছিল, যার লক্ষ্য ছিল তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সীমা নির্ধারণ করা।
ধারণা করা হয়, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়।
এর অর্থ কী?
উভয়পক্ষের বিবৃতি থেকে বোঝা যায়, মূলত কোনো পক্ষই ইরান প্রশ্নে নিজেদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। চীন স্পষ্ট করেছে যে তারা শি জিনপিংয়ের চার দফা পরিকল্পনাই অনুসরণ করবে। আর যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরোধিতার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মার্কিন নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা ছিল না।
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে চীনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপ প্রয়োগ করার পরও, সম্মেলনের ঠিক আগে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ কথা বলতে শুরু করেন যে, তাদের বেইজিংয়ের সহায়তার প্রয়োজন নেই।
গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, "আমি মনে করি না ইরান ইস্যুতে আমাদের কারও সাহায্য দরকার।"
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র "যেভাবেই হোক" এই যুদ্ধে জয়ী হবে।
একই দিনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ক্যাপিটল হিলে ইরান যুদ্ধ এবং এর ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে শুনানিতে সাক্ষ্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, ইরানের ওপর চীনের "অনেক প্রভাব" রয়েছে। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন, "আমার মনে হয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই রয়েছে।"
তবে বৈঠকের আগে এবং বৈঠক চলাকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা চীনের কাছে তাদের অনুরোধ আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
গত সপ্তাহে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, "ইরানের হামলার কারণে প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা সেটি আবার খুলে দিচ্ছি। তাই আমি চীনকে এই আন্তর্জাতিক অভিযানে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।"
আর বৃহস্পতিবার চীনে অবস্থানকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন বেইজিংকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করবে। যদিও তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চীনের সহায়তা প্রয়োজন নেই।
চীন এবং জ্বালানি আমদানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নির্ভরতার প্রসঙ্গ টেনে রুবিও বলেন, "এটি সমাধান করা তাদের নিজেদের স্বার্থেই প্রয়োজন।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা আশা করি, ইরান বর্তমানে পারস্য উপসাগরে যা করছে এবং করার চেষ্টা করছে, তা থেকে সরে আসতে চীন আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবে।"
