নিষিদ্ধ রুবিও এখন বেইজিংয়ের অতিথি, যে কৌশলে জটিলতা এড়ালো চীন
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একসময় ছিলেন চীনের কট্টর সমালোচক। ২০২০ সালে তার ওপর দেশটিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছিল বেইজিং। তবে বৃহস্পতিবার সেই রুবিওকেই বেইজিংয়ের 'গ্রেট হল অব দ্য পিপল'-এ চীনা কর্মকর্তাদের মুখোমুখি বসতে দেখা গেল। তবে তার টেবিলের সামনে থাকা নেমপ্লেটে 'রুবিও' নামের একটি নতুন চীনা বানান ব্যবহার করা হয়েছে, যা মূলত তার এই সফরকে সম্ভব করে তুলেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শীর্ষ বৈঠকের আগেই এই পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়েছিল। ২০২৫ সালে ট্রাম্প যখন রুবিওকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেন, তখন থেকেই চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সরকারি নথিতে রুবিওর নামের 'রু' বা 'লু' অংশের জন্য আগের চেয়ে ভিন্ন একটি অক্ষর ব্যবহার শুরু হয়।
এই পরিবর্তনটি চীন বেশ নীরবে করলেও চলতি সপ্তাহে এটি দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্বাগত অনুষ্ঠানে রুবিওকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে হাত মেলাতেও দেখা গেছে।
রুবিওর ক্ষেত্রে নামের এই পরিবর্তনকে একটি অত্যন্ত চতুর কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। যেহেতু বেইজিং আগের একটি নির্দিষ্ট বানানের অধীনে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, তাই নতুন বানানের মাধ্যমে সেই আইনি জটিলতা এড়িয়ে রুবিওকে বেইজিংয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
সাবেক চীনা কূটনীতিক ঝাং জিয়াডং এ বিষয়ে বলেন, 'চীন নিজেকে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বের করে আনার পথ তৈরি করেছে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে পারি না, কারণ সেগুলো নির্দিষ্ট কারণেই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রবেশে বাধা দেওয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আরও ক্ষতি করতে পারত। তাই আমরা একটি মাঝামাঝি পথ খুঁজে নিয়েছি।'
বেইজিং দাবি করেছে যে, ২০২০ সালের সেই নিষেধাজ্ঞা মূলত রুবিওর তখনকার কর্মকাণ্ডের জন্য ছিল যখন তিনি একজন মার্কিন সিনেটর ছিলেন। বর্তমানে তার পদের গুরুত্ব বিবেচনা করে বেইজিং পুরনো নিষেধাজ্ঞাকে বড় ইস্যু করতে চাচ্ছে না।
সাংহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর আমেরিকান স্টাডিজের ডেপুটি ডিরেক্টর ঝাও মিংহাও বলেন, 'পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রুবিও এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য চরিত্র। এটি মাথায় রেখেই বেইজিং পুরনো নিষেধাজ্ঞাকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না।' তিনি আরও জানান, রুবিওর বর্তমান অবস্থান বেইজিংয়ের কাছে আগের চেয়ে কিছুটা নমনীয় মনে হচ্ছে।
কিউবান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত রুবিও দীর্ঘদিন ধরে হংকংয়ের গণতন্ত্রকামী আন্দোলন, জিনজিয়াংয়ের উইঘুর মুসলিমদের প্রতি আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে চীনের তীব্র সমালোচনা করে আসছিলেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন নীতি এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।
রুবিওর নামের এই বানান পরিবর্তনের পেছনে একটি সূক্ষ্ম বিদ্রুপও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের বানানে ব্যবহৃত 'রু' (卢) অক্ষরটি ছিল একটি নিরপেক্ষ পারিবারিক নাম। কিন্তু বর্তমানে ব্যবহৃত নতুন অক্ষরটি (鲁) অর্থগতভাবে 'বেপরোয়া, রুক্ষ বা আনাড়ি' হিসেবে পরিচিত। এটি হয়তো রুবিও সম্পর্কে চীনের প্রকৃত মনোভাবেরই এক গোপন বহিঃপ্রকাশ।
