গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ: বেইজিংয়ে ট্রাম্প-শি বৈঠক সামনে রেখে অমীমাংসিত যেসব বড় প্রশ্ন
গত ২০ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী মাসে চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের জন্য বেইজিং সফর করবেন। এই সফরের আলোচনার প্রধান এজেন্ডা হিসেবে নির্ধারিত ছিল—মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ।
এর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের ওপর যৌথ বিমান হামলার অনুমোদন দেন ট্রাম্প, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন যুদ্ধের দাবানল জ্বলে ওঠে। এই যুদ্ধের রেশ ওই অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে সুদূর বেইজিংকেও উদ্বিগ্ন করে তোলে। ফলশ্রুতিতে দুই নেতার পূর্বনির্ধারিত শীর্ষ সম্মেলনটি স্থগিত করা হয়।
এখন সেই বহুল প্রতীক্ষিত ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলন আগামী ১৩-১৫ মে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে এই মধ্যবর্তী সময়ে চীনের এজেন্ডায় বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে।
বেইজিং এখন এটি নিশ্চিত করতে চায় যে, গত বছর ট্রাম্প ঘোষিত আকাশচুম্বী শুল্ক—যা গত অক্টোবরে দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির আগে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল—তা যেন আর ফিরে না আসে।
তবে চীনের জন্য এখন শুল্কের চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার পথ খুঁজে বের করা। উল্লেখ্য, চীনের মোট অপরিশোধিত তেলের অর্ধেকই এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিশাল মজুতের কারণে চীন অন্য এশীয় দেশগুলোর তুলনায়— এই জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি চীনের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল হুমকি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতোমধ্যে এমন মন্দার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। চীনের জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে রপ্তানি থেকে। যদি বিশ্বের বাকি দেশগুলোর পণ্য কেনার সক্ষমতা কমে যায়, তবে চীন বড় ধরণের ক্ষতির মুখে পড়বে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র অ্যাডভাইজার আলি ওয়াইন গত সপ্তাহে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, "এমন কোনো দেশ নেই... যার জাতীয় স্বার্থ এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার মাধ্যমে রক্ষিত হবে।" তিনি আরও যোগ করেন, "হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে স্বল্পমেয়াদী বিঘ্ন মোকাবিলায়— এশিয়ার অনেক মার্কিন মিত্র ও অংশীদারের তুলনায় চীন অনেক বেশি প্রস্তুত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থা তাদের জন্য অত্যন্ত সমস্যাজনক হয়ে দাঁড়াবে।"
ফলে এই ট্রাম্প-শি সম্মেলনের ওপর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—এই সংঘাত নিরসনে চীন আসলে কী করতে পারে?
গত মাসে খবর পাওয়া গিয়েছিল যে, পূর্ববর্তী দফার যুদ্ধবিরতি আলোচনায় চীনই মূলত ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছিল। গত সপ্তাহে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বেইজিংয়ে তার চীনা সমকক্ষ ওয়াং ই-র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চীনের বিবৃতির তথ্যমতে, ওয়াং মধ্যপ্রাচ্যে 'শত্রুতা সম্পূর্ণ নিরসনের' আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে চীন 'ইরানের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় সমর্থন জানায়'।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্রমশ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে তারা চীনের সক্রিয় সহায়তা চায়। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন চায় বেইজিং যেন জলপথটি (হরমুজ) পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে আরও জোরালো ভূমিকা রাখে।
এই বিষয়টি বিশ্বের দুই শক্তিশালী রাষ্ট্রের নেতাদের বৈঠকের সমীকরণকে অনেকটাই বদলে দিতে পারে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক দালি ইয়াং বলেন, ট্রাম্প এখন "এমন এক পরিস্থিতিতে আছেন, যেখানে তিনি নিজেই চীনা প্রেসিডেন্টের কাছে সাহায্য চাইছেন।" তিনি মনে করেন, এটি ট্রাম্পকে "এমন একটি অবস্থানে নিয়ে গেছে, যার সাথে তিনি মোটেও অভ্যস্ত নন।"
ইরানের ওপর এই প্রভাব খাটিয়ে বেইজিং হয়তো সম্মেলনের অন্য দুটি প্রধান আলোচ্য বিষয়—বাণিজ্য এবং তাইওয়ান ইস্যুতে কার্যকর 'লেভারেজ' বা দরকষাকষির সুবিধা আদায় করে নিতে চাইবে।
এদিকে বাণিজ্য যুদ্ধ চললেও গত বছর চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের উদ্বৃত্ত রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল খোদ যুক্তরাষ্ট্র।
দালি ইয়াংয়ের মতে, এই বাণিজ্য যুদ্ধে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আকাশচুম্বী শুল্ক আরোপ থেকে শুরু করে বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করার মতো পাল্টাপাল্টি নীতি গ্রহণ করেছে, যা অনেকটা 'সুমো রেসলিং' বা বিশালদেহী পালোয়ানদের কুস্তির মতো। তিনি বলেন, "উভয় পক্ষই লড়ে শেষ পর্যন্ত ড্র করেছে।"
যদিও ইয়াং-সহ অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন না যে, এই বৈঠকে বাণিজ্যিক চুক্তিতে বড় কোনো সাফল্য আসবে। এর পরিবর্তে একটি সাধারণ বিবৃতি আসতে পারে যা "উভয় পক্ষকেই বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়েছে বলে দাবি করার সুযোগ দেবে।" এর সম্ভাব্য ফলাফল হতে পারে গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় হওয়া শুল্ক বিরতির মেয়াদ বাড়ানো।
সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক দা ওয়েই সম্প্রতি জার্মান মার্শাল ফান্ডের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বেইজিংয়ের জন্য এমন ফলাফল হবে এক ধরণের অস্বস্তিকর সমঝোতা। তিনি বলেন, "আমরা স্থিতিশীলতা এবং পূর্বাভাসযোগ্যতা চাই। অবশ্যই শুল্কের হার গুরুত্বপূর্ণ, তবে আমাদের কাছে পূর্বাভাসযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কেবল এক বছর বা কয়েক মাসের জন্য এটি স্থগিত রাখতে চাই না। এটি ব্যবসায়িক পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।"
দা ওয়েই আরও যোগ করেন, এই সম্মেলনের আরও বড় একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন হলো তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি। গত বছর মার্কিন কংগ্রেস তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেছিল। ট্রাম্প-শি সম্মেলনের আগে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি স্থগিত রেখেছে বলে জানা গেছে, তবে বেইজিং চায় এটি পুরোপুরি বাতিল করা হোক।
এদিকে কয়েক মাস ধরে বিতর্কের পর গত শুক্রবার তাইওয়ানের আইনসভা ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে। এই বাজেটটি সরকারের মূল চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ; যার অর্থ দাঁড়ায় এটি মার্কিন অস্ত্র ক্রয়ের ব্যয় মেটালেও তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ অস্ত্র উৎপাদনে বিশেষ সহায়তা করবে না। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর অর্থায়নে আরও বিলম্ব হওয়া হবে "চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কাছে একটি নতি স্বীকার বা আত্মসমর্পণ।"
বেইজিং জানে, অস্ত্র বিক্রির মতো বিষয়গুলো সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণে না থেকে কংগ্রেসের নজরদারিতে থাকে। তবে তারা ট্রাম্পের কাছ থেকে তাইওয়ান ইস্যুতে বক্তব্যের ক্ষেত্রে বড় ধরণের ছাড় আদায় করার চেষ্টা করতে পারে। তাইওয়ান স্বাধীনতা ইস্যুতে বর্তমানের "সমর্থন করি না"শব্দের বদলে যুক্তরাষ্ট্র যদি "বিরোধিতা করি" শব্দটি ব্যবহার করে, তবে সেটি বেইজিংয়ের জন্য বিশাল এক জয় হবে। কারণ তারা তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র সঙ্গে সাম্প্রতিক এক ফোনালাপে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, তাইওয়ান হলো "চীন-মার্কিন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।" তিনি তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে "চীন-মার্কিন সহযোগিতার নতুন পথ খুলে দেওয়ার" আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, বেইজিং বর্তমানের ট্রাম্প প্রশাসনকে আগের তুলনায় অনেক বেশি নমনীয় মনে করছে। ট্রাম্প চীনে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বিক্রির বিধিনিষেধ শিথিল করেছেন এবং তাইওয়ানের প্রতি বিশেষ কোনো জোরালো সমর্থন দেখাননি। এমনকি গুঞ্জন রয়েছে যে, তিনি মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশল থেকে 'চীন একটি হুমকি'—এমন উল্লেখকে বাদ দেওয়ার জন্য পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া বেইজিং সফরে তিনি শি জিনপিংয়ের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা প্রত্যাশা করছেন বলেও জানিয়েছেন।
অধ্যাপক দালি ইয়াং বলেন, চীন "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট শি-র প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করেছেন, তার অত্যন্ত প্রশংসা করে।"
