দীর্ঘ বিলম্ব কাটিয়ে চট্টগ্রামে গতি পাচ্ছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রকল্পটি আগামী জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা শেষে ডেভেলপার অ্যাগ্রিমেন্ট সম্পন্নের আশা করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন টিবিএসকে বলেন, "আগামী জুনের মধ্যেই চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের সঙ্গে জমির ডেভেলপার অ্যাগ্রিমেন্ট সইয়ের আশা করছি।"
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এগুলো সম্পন্ন হলে প্রকল্পের মূল অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শুরু হবে।
আনোয়ারায় প্রায় ৭৮৩ একর জমিতে সরকারি ভিত্তিতে (জিটুজি) চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) নির্মাণ করা হচ্ছে। নয় বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা এ প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকলেও ডেভেলপার অ্যাগ্রিমেন্ট না হওয়ায় এতদিন কাজে গতি আসেনি।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি ঘিরে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয় এবং বর্তমানে কাজের গতি আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে বেজা।
জানা গেছে, প্রকল্পটি বিলম্বিত হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। শুরুতে অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি)। কিন্তু তাদের সঙ্গে চুক্তি না হওয়ায় কয়েক বছর সময় নষ্ট হয়।
পরে ২০২২ সালে চীনা সরকারের পক্ষ থেকে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করা হয়।
এছাড়া ডিপিপি প্রণয়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়াও দীর্ঘ সময় নিয়েছে। প্রকল্পটির অফসাইট অবকাঠামো—যেমন সড়ক, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ—বেজা বাস্তবায়ন করবে, আর অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন কাজ করবে ডেভেলপার কোম্পানি। এই দুই অংশের কাজ এখনো পুরোপুরি সমন্বিতভাবে এগোয়নি।
বেজার একাধিক সূত্র জানায়, অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে চীনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি থাকলেও ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রোকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (ইপিসি) কন্ট্রাক্ট নিয়ে আলোচনা চলছিল, যা এখন শেষ পর্যায়ে। এ চুক্তি চূড়ান্ত হলেই ডেভেলপমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্টের পথে এগোবে বেজা।
১৪ মার্চ এক বৈঠকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর কাছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
এর পর গত সপ্তাহে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে প্রকল্পটির অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
আশিক চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, "বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়েছে এবং আনোয়ারার এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অগ্রাধিকারভুক্ত প্রকল্প হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। সিআরবিসির সঙ্গে ল্যান্ড ডেভেলপার অ্যাগ্রিমেন্ট জুনের মধ্যে করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।"
বিডা জানায়, বৈঠকে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, সিইআইজেড প্রকল্পের অগ্রগতি চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেবে।
বেজার উপসচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া মিঠু বলেন, "জমি অধিগ্রহণ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি চীনা ঋণের আওতায় বাস্তবায়িত হবে এবং চীনা সরকার মনোনীত প্রতিষ্ঠানই উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করবে।"
তিনি জানান, সম্ভাব্য বিনিয়োগ খাত হিসেবে টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্প কাঠামো ও অর্থায়ন
বেজা জানায়, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে একটি ফাস্ট-ট্র্যাক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২২১.১৮ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা) প্রেফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট হিসেবে চীন সরকারের কাছ থেকে আসার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় একটি জেটি নির্মাণ, জেটি থেকে সিইআইজেডে সংযোগ সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
চীনা সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
বেজা জানায়, কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে, কর্ণফুলী টানেল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
বর্তমানে জিটুজি ভিত্তিতে দেশে দুটি বিদেশি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেছে, যা তুলনামূলক দ্রুত অগ্রগতির উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং দেশি-বিদেশি, বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
