৪,১৮৯ কোটি টাকার অবকাঠামো প্রকল্পে গতি, বাস্তবায়নের পথে আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে নানা জটিলতায় আটকে থাকা চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইআইজেড) অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
আগামী ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের চীন সফর শুরু হওয়ার আগেই ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষর এবং প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।
এ লক্ষ্যে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির উদ্যোগী দপ্তর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।
বেজা সূত্র জানায়, চীনের এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল আগামীকাল (১০ জুন) বেজার সঙ্গে বৈঠক করবে। বৈঠকে প্রকল্পের অর্থায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডেভেলপার চুক্তি চলতি মাসেই সম্পন্ন করতে পারব বলে আশা করছি। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগেই চুক্তিটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।"
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে সরকারি (জিটুজি) ভিত্তিতে গড়ে তোলা হচ্ছে চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইআইজেড)। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এ প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন কাঠামো এবং প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন অগ্রগতি পায়নি।
জানা গেছে, প্রকল্পটি বিলম্বিত হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। শুরুতে অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি)। কিন্তু তাদের সঙ্গে চুক্তি না হওয়ায় কয়েক বছর সময় নষ্ট হয়।
পরে ২০২২ সালে চীনা সরকারের পক্ষ থেকে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করা হয়।
এ ছাড়া ডিপিপি প্রণয়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়াও দীর্ঘ সময় নিয়েছে। প্রকল্পটির অফসাইট অবকাঠামো—যেমন সড়ক, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ—বেজা বাস্তবায়ন করবে। আর অভ্যন্তরীণ উন্নয়নকাজ করবে ডেভেলপার কোম্পানি। এই দুই অংশের কাজ সমন্বিতভাবে এগোতে না পারায় এতদিন প্রকল্পটি আটকে ছিল।
বেজা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি চূড়ান্ত হলে অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে।
একনেকে উপস্থাপিত পুনর্গঠিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হবে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, জেটি-সংযোগ সড়ক ও সেতু, চার লেনের সড়ক, ২৫ মিলিয়ন লিটার সক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও ট্রান্সমিশন লাইন, গ্যাস সরবরাহ অবকাঠামো, পানি সংরক্ষণাগার, বাউন্ডারি ওয়ালসহ অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো।
প্রকল্পে মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং চীনের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) ঋণের আওতায় পাওয়া যাবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা।
প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বেজা বলেছে, চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলাকে প্রকল্প এলাকা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে, যা ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত যৌক্তিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এ এলাকার কাছেই অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল। পাশাপাশি দেশের প্রধান সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে এ অঞ্চলের সরাসরি সংযোগ রয়েছে, যা আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম আরও সহজ করবে।
বেজা আশা করছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে চীনা এবং অন্যান্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বেপজার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, একনেকের অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি পাঁচ বছর মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে এবং ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, "পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে পাঁচ বছর সময় ধরা হলেও প্রথম তিন বছরের মধ্যেই অন্তত ৬০ শতাংশ কারখানা স্থাপনের উপযোগী প্লট প্রস্তুত করা হবে।"
