ব্যাপক চাহিদা থাকায় দেশে ব্যবসা বাড়াতে চায় ৫৭% জাপানি প্রতিষ্ঠান: জেট্রোর জরিপ
বাংলাদেশে ব্যবসারত জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৫৬.৯ শতাংশ আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। এই হার ভিয়েতনামের সমান এবং বৈশ্বিক গড় ৪৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সাম্প্রতিক এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে।
জরিপ অনুযায়ী, ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের (৮১.৫%) চেয়ে নিচে থাকলেও পাকিস্তানের (৬৩.৪%) কাছাকাছি এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় হারের (৪৬.৩%) চেয়ে বেশি। এতে বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান আকর্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে।
রোববার (৩০ মার্চ) ঢাকা ও জেট্রোর যৌথ আয়োজনে 'জাপান বিজনেস ডে' অনুষ্ঠানে এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। জরিপটি গত ১৯ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল।
শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদাই বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রধান কারণ। ৬৬.৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বাজারের প্রবৃদ্ধিকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। জরিপে বিনিয়োগ পরিবেশের শীর্ষ ৫টি সুবিধার কথা বলা হয়েছে: শ্রমের কম মজুরি, বাজারের আয়তন বাড়ার সম্ভাবনা, স্থানীয় কর্মী নিয়োগে সহজলভ্যতা এবং ভাষা বা যোগাযোগে জটিলতা কম থাকা।
বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী হলেও ব্যবসায়ীরা বেশ কিছু ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন। ৯৪.৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক বা সামাজিক অস্থিরতাকে বড় ঝুঁকি মনে করে। এছাড়া সময়সাপেক্ষ কর প্রক্রিয়া (৮১.৫%), নীতি অনিশ্চয়তা (৬৬.৭%), প্রশাসনিক বিলম্ব (৬৬.৭%) এবং দুর্বল আইনি কাঠামোর (৬৬.৭%) কথা উঠে এসেছে জরিপে।
এ বিষয়ে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, জরিপটি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তিনি মনে করেন, আরও হালনাগাদ তথ্য নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে। কর জটিলতা ও লাইসেন্সিং সংক্রান্ত সমস্যার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, 'স্পষ্টতই আমরা যথেষ্ট করতে পারিনি, এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে।' তবে সরকারের চলমান সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়িক আস্থার উন্নতির ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে জরিপে। ২০২৬ সালে পরিচালন মুনাফা বাড়বে—এমন প্রত্যাশা করা প্রতিষ্ঠানের হার ২০২৫ সালের তুলনায় ১১.৯ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। পাশাপাশি ২৯.৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে—যা জরিপভুক্ত বাজারগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাপানি রাষ্ট্রদূত শিনিচি সাইদা বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তিনি নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) বা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এ ধরনের কাঠামোকে স্বল্পমেয়াদী লাভের চেয়ে কয়েক দশকের দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা উচিত।
জরিপ অনুযায়ী, উৎপাদনশীল নয় এমন খাতে ব্যবসা বাড়ানোর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি (৬২.২%), যেখানে উৎপাদনশীল খাতে এই হার ৪৭.৬ শতাংশ।
২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশে মুনাফা বাড়বে—এমন প্রত্যাশা করা প্রতিষ্ঠানের হার ১১.৯ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে, যা জরিপভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে ২৯.৪ শতাংশ কোম্পানি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এ সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উন্নয়ন সহযোগিতা (ওডিএ) থেকে সরে এসে বেসরকারি খাতভিত্তিক বিনিয়োগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, 'জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হলেও, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সরকার নতুন অর্থনৈতিক মডেলের দিকে এগোতে চায়।'
