ইরান যুদ্ধের মধ্যে বেড়েছে জ্বালানি সংকট: আমদানিতে মাসে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার
২০২৬ সালের শুরুতেই ক্রমবর্ধমান চাপের মুখোমুখি বাংলাদেশের জ্বালানি খাত। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক অভিঘাত ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার দ্বিমুখী চাপে এই খাতে অস্থিরতা বাড়ছে। ফলে প্রতি মাসে জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ৭৬০ মিলিয়ন থেকে ৮৩০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে।
লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরি রিসার্চ-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চিত্র ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ এনার্জি সেক্টর: ক্রাইসিস, কস্ট অ্যান্ড ট্রানজিশন শীর্ষক এই প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশ এক 'আর্থিক জরুরি অবস্থা'র দিকে ধাবিত হচ্ছে।
চার সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ১২৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২২.৫১ ডলার হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত অদক্ষতা, বিশেষ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৬ সালের তুলনায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচগুণেরও বেশি বেড়ে বর্তমানে ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। তবে এই সক্ষমতার প্রায় ৬৩ শতাংশই অলস বসে থাকে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে না পারায় বছরে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হয়।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দামের মধ্যে ব্যবধান আরও বেড়েছে। বর্তমানে গড় উৎপাদন খরচ প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ১৮ থেকে ২২ টাকা পর্যন্ত প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর ফলে প্রতি মাসে ভর্তুকির চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা সংকট-পূর্ববর্তী সময়ের (৩-৪ হাজার কোটি টাকা) তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বিশ্ববাজারে দীর্ঘ সময় জ্বালানির উচ্চমূল্য বজায় থাকলে তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিংয়ের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
গবেষণায় 'বাপেক্স প্যারাডক্স' বা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতাকে একটি প্রধান উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও খনন করা হয়েছে মাত্র ৮টি, যা ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পট মার্কেট থেকে মাত্র এক মাসের এলএনজি আমদানিতে যে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, সেই অর্থ দিয়ে দেশে ১৫ থেকে ২০টি গ্যাস কূপ খনন করা সম্ভব। এসব কূপ থেকে পরবর্তী ১৫ বছরেরও বেশি সময় গ্যাস পাওয়া যেতে পারত।
গবেষণায় প্রাক্কলন করা হয়েছে, দেশীয় উৎস থেকে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা গেলে বছরে প্রায় ৮২ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।
প্রতিবেদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্রমবর্ধমান উপযোগিতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৮.২৭ সেন্ট বা প্রায় ৯.০৯ টাকা—যেখানে হেভি ফুয়েল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২৬ টাকা ও ডিজেলে ৩২.৫৩ টাকা খরচ হয়।
তবে নীতিগত অনিশ্চয়তা এই খাতের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যাগ্রিমেন্ট-এর (আইএ) কাঠামো বাতিল করার ফলে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটেরও বেশি সৌর প্রকল্প বিলম্বিত হচ্ছে। এই কাঠামো ফের চালু করলে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসার পথ প্রশস্ত হতে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাইরে শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে এই গবেষণা। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও সিরামিকের মতো খাতগুলোতে ওয়েস্ট হিট কাজে লাগিয়ে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব।
একে 'ফ্রি এলএনজি' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যা অতিরিক্ত আমদানি ছাড়াই ১৩ থেকে ২৭টি নতুন গ্যাসকূপের সমান উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিবেদনে বাংলাদেশ এনার্জি ইন্ডিপেন্ডেন্স প্রোগ্রাম (বিইআইপি) চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ২০৪০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির হার ৬০-৭০ শতাংশে উন্নীত করা।
এর আওতায় সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার, সৌর অবকাঠামো সম্প্রসারণ, শহরাঞ্চলে রুফটপ সোলার প্যানেল উৎসাহিত করা ও ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের বদলে সৌর পাম্প ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চাইলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির রপ্তানিকারক দেশেও পরিণত হতে পারে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বছরে ৫০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জ্বালানি রূপান্তরের ব্যয় বহন করতে পারবে কি না, প্রশ্ন সেটি নয়। বরং প্রতি ব্যারেল তেল যখন ১০৫ ডলার, তখন বাংলাদেশের পক্ষে এই রূপান্তর প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকা সম্ভব নয়। প্রতি এক মাসের বিলম্ব দেশের অর্থনীতির প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার লোকসান ঘটাচ্ছে।
