২.৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন, ৯৬ শতাংশ প্রার্থীই রক্ষা করতে পারেননি জামানত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে ভরাডুবির মুখে পড়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৫৭টিতে প্রার্থী দিয়ে জয় পেয়েছে মাত্র একটি আসনে। মোট ভোটের মাত্র ২.৭০ শতাংশ পেয়েছে দলটি। আর প্রার্থীদের ৯৬ শতাংশই রক্ষা করতে পারেননি জামানত।
নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে চরমোনাইয়ের আসন ভাগাভাগি নিয়ে টানাপোড়েন ছিল। গণঅভ্যুত্থানের নেতা এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী দেওয়া নিয়েও আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোট না করে ওই আসনেও প্রার্থী দেয় দলটি।
ফলাফলে দেখা যায়, ওই আসনে নাহিদ ইসলাম শাপলা কলি প্রতীকে ৯৩,৮৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী পান ৯১,৮৩৩ ভোট। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী শেখ ফজলে বারী মাসউদ পান ৪,৩৭৫ ভোট, যা মোট ভোটের ২.২৬ শতাংশ। ফলে তিনি জামানত হারান।
নির্বাচন কমিশনের আরপিও অনুযায়ী, মোট বৈধ ভোটের কমপক্ষে ১২.৫ শতাংশ না পেলে প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
এবারের নির্বাচনে দলটি ২৫৭টি আসনে অংশ নেয়। টিবিএসের হাতে থাকা ২২৭টি আসনের ফলাফলে দেখা যায়, সবকটিতেই প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ আসনে তারা জামানত রক্ষা করতে পারেননি। সিংহভাগ আসনে ১ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েছেন প্রার্থীরা।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কোনো আসনেই দলটির প্রার্থীরা জামানত রক্ষা করতে পারেননি। ঢাকা বিভাগে মাত্র একটি আসনে জামানত রক্ষা হয়—নরসিংদী-৫ আসনে ইসলামী সংগীতশিল্পী বদরুজ্জামান উজ্জলের মাধ্যমে।
সবচেয়ে বেশি জামানত রক্ষা হয়েছে বরিশাল বিভাগে। এখানে প্রায় আটটি আসনে জামানত বাঁচাতে সক্ষম হয় দলটি। এর মধ্যে বরগুনা-১ আসনে মাওলানা মাহমুদুল হাসান উলীউল্লাহ ৪৯.৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। পটুয়াখালী-৪ আসনে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ৩৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জামানত রক্ষা করেন।
দলটির আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের তিন ভাই নির্বাচনে অংশ নিলেও কেউ জয়ী হতে পারেননি।
দলের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ (সদর-সিটি করপোরেশন) আসনে ৯৩,৫২৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। এখানে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার ১,৩১,৪৩১ ভোট পেয়ে জয়ী হন।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে ফয়জুল করীম ২৮,৮২৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। এ আসনে বিএনপির আবুল হোসেন খান পান ৮১,০৮৭ ভোট এবং জামায়াতের প্রার্থী মো. মাহমুদুন্নবী পান ৫৪,৫৩৩ ভোট।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের ৩৬,৭৫৩ ভোট পান। একই আসনে বিএনপির রাজীব আহসান পান ১,২৮,৩২২ ভোট এবং জামায়াতের মোহাম্মদ আবদুল জব্বার পান ৭৪,৬৮৪ ভোট।
ঢাকা-৪ আসনে মোট ৪৫ শতাংশ ভোট পড়ে। এখানে জামায়াতের সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ৭৭,৩৬৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির তানভীর আহমেদ পান ৭৪,৪৪৭ ভোট। হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ পান ৬,৫১৮ ভোট। ফলে তার জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়।
নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেন, 'জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করলে বেশি আসন পাওয়া সম্ভব ছিল, তবে আদর্শের প্রশ্নে আমরা আপস করিনি।'
তিনি অভিযোগ করেন, 'নির্বাচনে আমাদের বড় বাজেট ছিল না। বরং আমাকে হারাতে শতকোটি টাকার বাজেট ব্যয় হয়েছে।'
বরিশালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয় থাকলেও ভোটে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। জামায়াতের সঙ্গে জোট না হওয়ায় ভোট বিভক্ত হয়েছে এবং এর সুবিধা পেয়েছে বিএনপি।
সুজন বরিশাল নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, 'চরমোনাই দরবারের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব থাকলেও তা এখনো কার্যকর ভোটব্যাংকে রূপ নেয়নি। সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দলটির সীমিত ভোটভিত্তি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
