ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা: রাষ্ট্র পরিচালনায় শরীয়াহ অনুসরণের অঙ্গীকার
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। রাষ্ট্র গঠনের নীতিগত অবস্থানের অংশ হিসেবে দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা তথা শরীয়াহ অনুসরণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই ইশতেহার পাঠ করেন ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই)।
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে জানানো হয়, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাগ্রত হওয়া জনপ্রত্যাশাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত করতেই এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে। ইশতেহারটিকে প্রধানত তিনটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে: রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত অবস্থান, রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা এবং খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা।
ইশতেহারে ইসলামের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলা হয়, 'মানুষের সবচেয়ে বড় যৌথ প্রকল্প রাষ্ট্র ও শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে ইসলামের নির্ধারিত, বিস্তৃত এবং বহু শতাব্দি চর্চিত রীতি-নীতি ও বিধিমালা রয়েছে। যার আলোকে ১৩শ বছর মানবসভ্যতা শান্তি ও সমৃদ্ধির সাথে পরিচালিত হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামের মৌলিক নীতিমালার মধ্যে রয়েছে আদালত, ইনসাফ, নাগরিকের স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতা, দায়বদ্ধতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে এই মৌলিক নীতিমালার পূর্ণ প্রতিপালন করবে।'
একই সঙ্গে দলটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতার চর্চা এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইশতেহারে সকল ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু হিসেবে বিভাজন করে বৈষম্য করা হবে না। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে বৈদেশিক সম্পর্ক গড়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়।
সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ইশতেহারে একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে 'ন্যায়পাল' প্রতিষ্ঠান কার্যকর করা, সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত করা, জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব নিয়মিত প্রকাশ এবং নাগরিকদের অভিযোগের জন্য কেন্দ্রীয় জবাবদিহিতা পোর্টাল চালু করা।
দুর্নীতিকে দেশের প্রধান অন্তরায় চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত, সরকারি নিয়োগ এবং সেবাখাতে দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দলটি সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকার করেছে। দলটির মতে, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অস্থিরতা নিরসনে পিআর পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এছাড়া একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন রোধে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
নাগরিকদের জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে ইশতেহারে ১২ দফার বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— হতদরিদ্রদের জন্য মাসিক নগদ সহায়তা, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ, যুবকদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, জাতীয় চাকরি পোর্টাল এবং নারী শ্রমিকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা।
পাশাপাশি ইশতেহারে অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষাসহ ২৮টি খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দাবি, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
