সুশাসন ও সার্বজনীন শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে খেলাফত মজলিসের ২২ দফা ইশতেহার
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুশাসন এবং সার্বজনীন ও নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থাসহ অন্তত ৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইশতেহারের বিস্তারিত তুলে ধরেন দলের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
পাঁচটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই ইশতেহারে মোট ২২টি দফা রয়েছে, যা একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ইশতেহারে সরকার পরিচালনায় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় ৬টি হলো—সুষম উন্নয়ন ও নাগরিক জীবনের মৌলিক অধিকার, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা, স্বাধীন ও স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি, সার্বজনীন ও নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও তরুণদের অঙ্গীকার।
ইশতেহারের অন্যান্য প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে—রাষ্ট্র পরিচালনায় কুরআন ও সুন্নাহ সর্বোচ্চ নির্দেশনা হিসেবে থাকবে। কাদিয়ানি ও আহমদিয়া সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হবে। সাহাবায়ে কেরামকে রাষ্ট্রীয় নীতির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হবে। সুদমুক্ত ইসলামি অর্থনীতি চালু করা হবে। সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা একটি সর্বজনীন জাতীয় সিলেবাসের অধীনে পরিচালিত হবে, যেখানে কুরআন–হাদিসভিত্তিক নৈতিক শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইংরেজি ও আইটির সমান গুরুত্ব থাকবে। কওমি মাদ্রাসার উন্নয়নে স্বায়ত্তশাসিত মঞ্জুরি কমিশন গঠন করা হবে। সব নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়া কৃষিপণ্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সহজ করা হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সবার জন্য মানসম্মত, সহজলভ্য ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে—সাংবাদিক হত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং মিথ্যা মামলা ও হয়রানি বন্ধ করা হবে। প্রবাসীদের জন্য বিনা সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু করা হবে এবং বিমানবন্দরসহ সব পর্যায়ে হয়রানি শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। চাঁদাবাজি বন্ধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালানো হবে। ঘুষ, দুর্নীতি ও অপচয়কে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। টেন্ডারবাজি, ক্যাডার বাহিনী ও সন্ত্রাসী রাজনীতিকে রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। গুম, খুন ও অপহরণ বন্ধে বিশেষ পর্যবেক্ষণ সেল ও দক্ষ তদন্ত ইউনিট গঠন করা হবে। ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে দলটি দাবি করে, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। উন্নয়নের বাহ্যিক বয়ানের আড়ালে রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্রমে দমনমূলক, বৈষম্যমূলক ও জবাবদিহিহীন রূপ নিয়েছে।
দলটি আরও জানায়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে এই সময়ে শত শত জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গায়েবি মামলা এবং কারাগারে অমানবিক নির্যাতনের তথ্য উঠে এসেছে। 'আয়নাঘর'সহ গোপন আটককেন্দ্রের অস্তিত্ব রাষ্ট্রীয় গুম তদন্ত কমিশনের নথিতেও উল্লেখ রয়েছে। শাপলা চত্বর, হেফাজতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের অভিযোগও তোলা হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনের অপব্যবহারের কথাও বলা হয়। সাংবাদিক, আলেম, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দিয়ে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
দলটি আরও দাবি করে, এ সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। একতরফা নির্বাচন, রাতের ভোট এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে এবং গণতন্ত্রকে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করা হয়েছে। উন্নয়নের নামে মেগা প্রকল্পে লুটপাট, ব্যাংক কেলেঙ্কারি, খেলাপি ঋণের পাহাড় ও ডলার সংকট তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
খেলাফত মজলিস জোর দিয়ে বলেছে, তাদের এই ইশতেহারের লক্ষ্য কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য নয়; বরং ইসলামী নীতি ও মানবিক মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত সত্য, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান।
